মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে গর্ভ/বতী হলো লালবানু। বর্ষার এক দুপুরে এই সুখবরটি এলো তার কাছে। তবে লালবানুর জন্য এই বিষয়টি সুখের ছিলো না। তার চোখেমুখে বিষন্নতা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। লালবানুর বিষন্ন মুখশ্রী দেখে তার জা ফরিদা বেগম বলেন,“কি হয়েছে তুমি খুশি নও?”
লালবানু জবাব দেয় না। ফরিদা বেগমের আড়ালে তার চোখের কোনে আসা অশ্রুটি মুছে ফেলে।
__
সাল ১৯৯০,
বাবা-মা হারা এতিম লালবানু বারো বছর বয়সে গ্রামের মাতব্বর মাজেদ খাঁ এর বঁধুরূপে খাঁ বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়। বঁধুসাজে তাকে বেশ মিষ্টি লাগছে। সদ্য কিশোরী জীবনে পা রাখা লালবানুর চোখেমুখে রঙীন স্বপ্ন। এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে সে বঁধুবরন শেষে খাঁ বাড়ির অন্দরমহলে প্রবেশ করে। দু'তলা বিশিষ্ট এই বাড়িতে লালবানুর জায়গা হয় উপরতলার এক বড় ঘরে। ছোট্ট কিশোরী তখনো জানতো না, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কি? শুধু জানতো, মামী বলেছে সে এখানে ভালো থাকবে। এই বাড়িটি তার। এই সংসার তার। এখানে সে স্বামীর ভালোবাসা পাবে, আদর পাবে, যত্ন পাবে। সবচেয়ে বেশি যেটা পাবে দু'বেলা দু'মুঠো ভালো খাবার। যেটা সে তার মামীর বাড়িতে পে'তো না।
লালবানু একবার বঁধুবেশে থাকা নিজেকে দেখে ম্লান হাসে। তারপর তার পেটে হাত দিয়ে ম্লান গলায় বলে,“ভাতের জ্বালা বড় জ্বালা।হাছাই কি আমি পেট ভইরা ভাত পাইবো এইখানে?”
প্রশ্নটি লালবানুর মনের মধ্যে জমা থাকে। তখনো সে জানতো না, এই বাড়িতে তার ভাতের অভাব নাহলেও অন্যকিছুর অভাব হবে। যেই অভাব সম্পর্কে সে অবগত নয়।
লালবানুকে ভাবনায় মগ্ন দেখে তার জা ফরিদা বেগম বলে,“কি ভাবছো নতুন বউ?”
“কিচ্ছু না।”
লালবানু ম্লান হেসে জবাব দেয়। ফরিদা বেগম বলে,“আমি তোমার কে হই জানো?”
“কে?”
লালবানু জানে না। তাই প্রশ্ন করে। জবাবে ফরিদা বেগম বলে,“আমি তোমার ছোট জা। তোমার দেবরের বউ।”
“ছোট জা?”
লালবানু কৌতূহলী হয়ে ওঠে। পুনরায় জিজ্ঞেস করে,“আপনে তো আমার চাইয়া বড় তাইলে ছোট কিভাবে হইলেন?”
ছোট্ট লালবানুর কথা শুনে ফরিদা বেগম শব্দ করে হেসে দেয়। তারপর বলে,“কারণ তুমি এই খাঁ বাড়ির বড় বউ। বয়স যতই ছোট হও না কেন সম্পর্কে তুমি আমার বড়।”
“আইচ্ছা।”
লালবানু মাথা নাড়ায়।সে বুঝতে পেরেছে। ফরিদা বেগম লালবানুর সাথে নানা গল্প শুরু করে দেয়। বিশেষ করে মাজেদ খাঁ এর ব্যাপারে অনেককিছু লালবানুকে বলে। এক পর্যায়ে ফরিদা বলে,“মাজেদ খুব ভালো আদর করতে পারে।”
“আপনে কিভাবে জানলেন?”
লালবানুর অবুঝ মন প্রশ্ন করে উঠে। ফরিদা বেগম কিছুটা হচচকিয়ে যায়। তারপর বলে,“আসলে আমার বড় জা বলতো। তার ব্যাপারে নানা গল্প করতো। তখন জেনেছি।”
“বড় জা?”
লালবানুর কথায় ফরিদা মুচকি হাসে। তারপর বলে,“হ্যাঁ। তোমার আগে যে মাজেদ খাঁয়ের বউ ছিলো। ”
লালবানু মাজেদ খাঁয়ের দ্বিতীয় বউ। এটা শুনে লালবানু কিছুটা অবাক হয়। তার মামী তাকে এই বিষয়ে বলেনি। অন্যদিকে ফরিদা বেগম তার বড় জায়ের ব্যাপারে নানা গল্প করে যায়।
*
বাসর ঘরে লালবানুকে বসিয়ে রেখে ফরিদা তার বিধবা শাশুড়ী মালেকা বেগমের কাছে যায়। মালেকা বেগম ফরিদাকে দেখে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,“কিছু বলবে?”
“বলছিলাম আম্মা, কয়েকদিন লালবানুকে আপনার সাথে রাখলে হ'তো না। আসলে ও খুব ছোট....।”
ফরিদা বেগমকে বাক্যটি সমাপ্ত করতে না দিয়ে মালেকা বেগম বলে,“যে মাইয়া লাল/সুতা দেখে সেই মাইয়া আবার ছোট হয় কিভাবে? মাইয়া মেলা বড় হইছে। সোয়ামি একবার আদর কইরা দিলেই সব বুইঝা যাইবো।”
ফরিদা বেগম কথা বাড়ায় না। কারণ লাভ নাই। মালেকা বেগম পুনরায় বলে,“লালবানু কি? তোমার বড় হয়। ভাবী কইবা।”
“আচ্ছা।”
ফরিদা বেগম মাথা নাড়িয়ে চলে যায়। মালেকা বেগম হাতের পানটি গোল করে মুখের ভেতর দিয়ে দেয়। পান চাবাতে চাবাতে বলে,“ছোট। ছোট হইলে বিয়া দিছিলো ক্যান? আমরা বিয়া করি নাই, নয় বছর বয়সে বিয়া করছি। দশ বছরে লাল/সুতা দেখার লগে লগে বাসর করছি।”
বিরক্ত কন্ঠে ফরিদা এবং লালবানুকে উদ্দেশ্য করে কয়েকটা গা/লি দিয়ে দেয় মালেকা বেগম।
*
লালবানু বাসর ঘরে বসে রয়েছে। তার কিছুটা ভয় করছে। সেই সময়ে দরজা খুলে মাজেদ খাঁ প্রবেশ করে। লালবানু তার উপস্থিতি বুঝতে পেরে আরও ভয় পায়। মাজেদ খাঁ ধীরে ধীরে লালবানুর পাশে এসে বসে। আস্তে করে লালবানুর হাত ধরে। লালবানু কিছুটা কেঁপে উঠে। মাজেদ শান্ত এবং স্পষ্ট গলায় বলে,“আজ হইতে তুমি এই বাড়ির বড় বউ। বড় বউ হওয়া কিন্তু চারটে খানে কথা না। বড় বউ মানে মেলা দায়িত্ব। তোমারে সেইসব দায়িত্ব পালন করতে হইবো। আমি জানো তোমার সম্পর্কে কোন অভিযোগ শুনি না। আম্মা বা বাড়ির অন্যকেউ তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে..।”
মাজেদের গলায় কিছুটা হুম/কির সুর শোনা যায়। লালবানু ভয়ে কেঁপে উঠে। মাজেদ খাঁ পুনরায় বলে,“তোমার মামীরে দুই ভরি স্বর্নের চেইন দিছি।সে তোমারে সব বুঝাইয়া শুনাইয়া পাঠাইছে তো?”
লালবানু মাথা নাড়ায়। হ্যাঁ তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে পাঠিয়েছে। মাজেদ বলে,“তাইলে তো হয়েই গেল। চলো বাসর শুরু করি।”
লালবানু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকায়। মাজেদ ধীরে ধীরে লালবানুর কাছাকাছি আসে। তবে লালবানু তাতে বাঁধা দেয় না। মামী এবং ফরিদা বেগম তাকে বলে দিয়েছে, মাজেদ এভাবে তার কাছে আসবে। তাতে তার অনেক ভালো লাগবে। কিন্তু কই? লালবানুর তো ভালো লাগছে না। তার কষ্ট হচ্ছে। কষ্টে না পেরে লালবানু চিৎকার দিয়ে উঠে। লালবানু চিৎকার দেওয়ায় মাজেদ তার মুখ চেপে ধরে বলে,“চিৎকার কইরা কি আমার মান-সম্মান ডুবাবি? চুপ কর।”
মাজেদের কন্ঠে হিংস্রতা ছিলো। লালবানু চুপ করে যায়। কিন্তু তা পারছে না এসব সহ্য করতে। এক পর্যায়ে লালবানু জ্ঞান হারায়।
_
সকালবেলা লালবানুর জ্ঞান ফিরতে সে নিজেকে বিছানায় আবিষ্কার করে। পাশে শাশুড়ী এবং জা বসা। লালবানুর জ্ঞান ফিরতে ফরিদা বেগম বলে,“এখন কেমন লাগছে? ব্যাথা করছে?”
লালবানু মাথা নাড়ায়। এর অর্থ হ্যাঁ তার ব্যাথা করছে। মালেকা বেগম গর্জে ওঠে। কর্কশ গলায় বলে,“হ্যাঁ আমাগো বিয়া হয় নাই। আমরা বাচ্চা পয়দা করি নাই। আমাগো সোয়ামি সোহাগ করে নাই।
কই আমাগো তো ব্যাথা লাগে নাই। তাগো একেবারে ব্যাথায় জান যায়।”
ফরিদা এবং লালবানু দু'জনে ভয়ে কেঁপে উঠে। তবুও সাহস করে লালবানু বলে,“আম্মা আপনের হাছাই ব্যাথা লাগে নাই?”
ফরিদা ভেবেছিলো মালেকা বেগম এবার আরও ক্ষিপ্ত হবে। কিন্তু না। তিনি কিছু বলেনি। শুধু একপলক লালবানুর দিকে তাকায়। তারপর বোধহয় নিজের প্রথম বাসরের কথা ভাবছিলো। তবে দ্রুত ভাবনা থেকে বের হয়ে কঠিন গলায় বলে,“ছোট বউ তোমার ভাবীরে বুঝাও, এইসব স্বাভাবিক। জামাই বউ আদর সোহাগ করবো এইটাই তো দুনিয়ার রীতি।”
ফরিদা বেগমকে আরও কিছু কথা বলে মালেকা বেগম বের হয়ে যায়। মালেকা বেগম চলে যেতে ফরিদা লালবানুকে উদ্দেশ্য করে বলে,“ক্ষুধা লাগছে?”
লালবানু মাথা নাড়ায়। ফরিদা বেগম লালবানুকে ধরে বসায়। তারপর বলে,“আমি খাবার নিয়ে আসছি।”
ফরিদা বেগম চলে যেতে রাতের কথা ভেবে লালবানুর চোখে অশ্রু চলে আসে।
*
লালবানু বিছানা থেকে নামে। মাত্রই ফরিদা বেগম খাবার খাইয়ে দিয়ে গেল। লালবানু সেটা খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলো। হঠাৎ মনে হলো, একটু উঠে হাঁটাহাঁটি করা দরকার। তাই উঠলো। লালবানু উঠে দাঁড়াতে তার মনে হলো সে দাঁড়াতে পারছে না। ভেতরটা কেমন জ্বা/লা/পোড়া করছে। লালবানু তৎক্ষনাৎ বিছানায় বসে পড়লো। সেই সময়ে মালেকা বেগমের গলা ভেসে আসলো। সে বলছে,“আমরা বউ আছিলাম না। আমরা সংসারের কাজ না কইরা ঘরের মধ্যে বইয়া থাকলে, আমাগো শাশুড়ীরা আমাগো খুন্তি দিয়া পিটাইতো। আর আমার বউরা ঘরের মধ্যে বইয়া রঙতামাশা করে।পোড়া কপাল আমার। আমার কপালেই এইয়া জুটছে।”
'
'
চলবে,
#লালবানু (১)
#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি
(জানি না সাড়া পাবো নাকি? আইডির অবস্থা খুবি খারাপ। রিচ নাই বললেই চলে। তবে চিন্তা নাই। যে কয়েকজন পড়বেন তাদের বলছি, এটা রেগুলার চালাবো। যারা পড়বেন দুই একজন গঠনমূলক মন্তব্য কইরেন যা দেখে আগ্রহ বাড়ে লেখার। লেখার মান কেমন হচ্ছে? আগের চেয়ে ভালো হচ্ছে)

Post a Comment