### পর্ব ৫: সত্যের খোঁজে
লালবানু বনের ধারে দাঁড়িয়ে যেন পাথর হয়ে গেছে। তার শরীর স্থির, কিন্তু মাথার ভেতরে চলছে এক ভয়ংকর ঝড়। মাজেদ খাঁ, তার স্বামী, এই ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রে কীভাবে থাকতে পারেন? তার প্রতি বিশ্বাস, ভালোবাসা—সব যেন মুহূর্তেই ধুলিসাৎ হয়ে গেল।
মাঝে মাঝে বাতাসে ভেসে আসা কথাগুলো লালবানুর মনকে আরও ভারী করে তুলছে।
“রফিকের ব্যাপার ঠিকঠাক হয়েছে,”— এই কথাগুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তাহলে কি রফিক সিকদারের হ/ত্যার পেছনে মাজেদ খাঁ সরাসরি জড়িত?
হঠাৎ লালবানুর পায়ের তলায় মাটি যেন আর নেই। তাকে কিছু একটা করতে হবে, কিন্তু কী করবে সে? মাজেদ খাঁ যদি এত বড় ষড়যন্ত্রের অংশ হন, তবে তার বিপক্ষে দাঁড়ানো মানে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা। তবু, কিছু একটা করার জন্য সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
***
সেদিন রাতে, লালবানু মাজেদ খাঁকে কিছু না জানিয়ে ঘরে ফিরে আসে। কিন্তু তার মন শান্ত থাকে না। সে নিজেকে একা, অসহায়, আর বিপদের মধ্যে আবিষ্কার করে। ঘুম আসছিল না। বারবার মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে যদি সে কোনো ভুল করে, তাহলে তার জীবন আরও কঠিন হয়ে যাবে।
পরের দিন সকালবেলা, মালেকা বেগমের গলা শুনেই লালবানু বাস্তবতায় ফিরে আসে।
“বউ, ওঠো। অনেক কাজ বাকি আছে।” মালেকা বেগম গম্ভীর গলায় ডেকে ওঠান।
লালবানু উঠে বসে, কিন্তু তার মন কাজের মধ্যে নেই। মালেকা বেগমের সামনে সে নীরবে কাজ করতে থাকে। তার মনে শুধু একটাই কথা—কীভাবে এই রহস্যের সমাধান করবে।
একসময় আলতাফ খাঁ ঘরে আসে। তার মুখে যেন কোনো গোপন বার্তা লুকানো ছিল, যা লালবানু স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে। আলতাফ খাঁ প্রায় ফিসফিস করে বলে, “তোমার সাথে কথা আছে। আজ বিকেলে বনের ধারে এসো।”
লালবানু কিছু না বলেই মাথা নেড়ে সায় দেয়। সে জানে, এই কথার ভেতর লুকানো আছে নতুন কোনো সত্য।
***
বিকেলে, লালবানু নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী বনের ধারে পৌঁছায়। আলতাফ খাঁ আগে থেকেই সেখানে অপেক্ষা করছিল। তার চোখেমুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
“তুমি জানো, রফিক সিকদারের মৃত্যু সাধারণ ঘটনা না,” আলতাফ সরাসরি বলল।
“হ্যাঁ, আমি জানি। কিন্তু সত্যিটা কী? তুমি কি সব জানো?” লালবানু একটু জড়সড়ভাবে জিজ্ঞেস করে।
আলতাফ খাঁ গভীরভাবে শ্বাস নিয়ে বলে, “আমার জানা কিছু জিনিস আছে। রফিক সিকদার আমাদের গ্রামের অনেক অপকর্মের সাক্ষী ছিল। তার কাছে এমন কিছু তথ্য ছিল যা প্রকাশ পেলে গ্রামেই বড় ধরনের ঝামেলা হতো। সে নিজেই এই কাজগুলোতে জড়িত ছিল, কিন্তু শেষ দিকে কিছু প্রভাবশালী মানুষের সাথে তার বিরোধ তৈরি হয়। সেই বিরোধের ফলাফলই তার মৃত্যু।”
“তাহলে… মাজেদ খাঁ?”— লালবানুর কণ্ঠে ভয় মিশে আছে।
আলতাফ খাঁ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে বলে, “তুমি যা ভাবছো, তা আংশিক সত্যি। তবে পুরো সত্যি এখনো তোমার সামনে আসেনি। মাজেদ খাঁ ওই ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল, কিন্তু তিনি একমাত্র নন। তার ওপরও চাপ ছিল। গ্রামের আরও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এই ষড়যন্ত্রের পেছনে রয়েছে।”
“কিন্তু আমি কী করব? আমি তো এইসব জানি না। আমি কিভাবে এসবের বিরুদ্ধে লড়ব?” লালবানু প্রায় অসহায়ভাবে প্রশ্ন করে।
আলতাফ খাঁ একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলে, “তুমি যদি সত্যিকারের সাহসী হও, তবে তোমাকে এই ষড়যন্ত্রের মুখোশ খুলে ফেলতে হবে। গ্রামের মানুষকে জানতে হবে, আসলে কারা এই খেলা চালাচ্ছে। আর আমি তোমাকে সাহায্য করব। কিন্তু মনে রেখো, এই পথ খুব বিপজ্জনক। তুমি যদি মাঝপথে ভেঙে পড়ো, তাহলে তোমার জীবন ধ্বংস হয়ে যাবে। ”
লালবানুর চোখে জল চলে আসে। সে বুঝতে পারে, এই পথ তার জন্য সহজ হবে না। তবু, সে চুপ করে থাকে না। তার মনে শুধু একটাই চিন্তা—সত্য উদঘাটন করা।
“আমি সব কিছু জানাতে চাই। কিন্তু কিভাবে?”—লালবানু কাঁপা গলায় বলে।
“প্রথমে কিছু প্রমাণ খুঁজে বের করতে হবে। যারা এই ষড়যন্ত্রের পেছনে আছে, তাদের কৌশল বুঝতে হবে। আর এজন্য কিছু সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে,” আলতাফ খাঁ বলে।
লালবানু আলতাফ খাঁর কথায় সাহস পায়। এই পথ যতই কঠিন হোক, সে পিছু হটবে না।
***
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। লালবানু বাড়ি ফিরে আসে, কিন্তু তার মন শান্ত নয়। সে জানে, সামনে বড় ঝড় আসছে। এই ঝড়ের সামনে কীভাবে টিকে থাকবে, সেই নিয়েই তার ভাবনা।
রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে, লালবানু আবার নিজের ঘরে চুপচাপ বসে থাকে। মাজেদ খাঁ তখন ঘরে নেই। সুযোগ বুঝে সে কিছু নথি এবং প্রমাণ খুঁজতে শুরু করে, যা তাকে আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে সত্যের।
হঠাৎই দরজায় একটি ধাক্কা আসে।
“তুমি কি আমাকে খুঁজছো?” মাজেদ খাঁ ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে। তার চোখে কিছু একটা কঠিন দৃষ্টি, যা লালবানুর শরীরকে শীতল করে তোলে।
লালবানু বুঝতে পারে, এখনই সব ফাঁস হওয়ার সময় এসেছে।
### চলবে...
**পর্ব ৫**-এ গল্প আরও উত্তেজনাপূর্ণ এবং জটিল হয়েছে। লালবানুর সামনে এখন বিপজ্জনক সত্য এবং কঠিন সিদ্ধান্তের মুহূর্ত। পরবর্তী পর্বে দেখা যাবে, সে কীভাবে এই পরিস্থিতি সামলাবে এবং সত্যের মুখোমুখি হবে।

Post a Comment