Top News

পর্ব (০২) মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে গর্ভ/বতী হলো লালবানু।

 #লালবানু (২)

#নুসরাত_জাহান_মিষ্টি


পাঁচদিন কেটে গেল। লালবানু ধীরে ধীরে মাজেদ খাঁয়ের সাথে মানিয়ে নিয়েছে। প্রথম দু'দিন অবশ্য জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তবে এখন ঠিক আছে। 


সকালবেলা, লালবানু গোসল করে বের হয়। দ্রুত পা চালিয়ে রান্নাঘরে চলে আসে। লালবানুকে দেখে তার শাশুড়ী মা বলে,“আসছেন সোয়ামি সোহাগী।”


“আম্মা একটু দেরি হইয়া গেল।”

লালবানুর মুখ দিয়ে বাক্যটি বের হ'তে যতটা সময় নিলো মালেকা বেগমের কাছ থেকে জবাব আসতে সময় নিলো না। তিনি কঠিন গলায় বলে,“রোজ দেরি হয় কিভাবে? এই বাড়ির বড় বউ হইয়া মাথা কিইনা নিছো? দায়িত্ববোধের বালাই নাই।”


“আমার দোষ নাই। আপনের পোলাই তো আমারে ছাড়ে না।”


“ছিঃ। ছিঃ। কি বউ এইটা ঘরে আনলো মাজেদ? সোয়ামির সোহাগের কথা কইতে মুখে বাজে না। ছিহ কি নির্লজ্জ।”

মালেকা বেগমের কন্ঠে এমন কথা শুনে লালবানু লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যায়। সেই সময়ে ফরিদা বেগমের স্বামী অর্থাৎ লালবানুর একমাত্র দেবর আলতাফ খাঁ আসে। মালেকা বেগম তার সামনে লালবানুকে একের পর এক কটু কথা শুনিয়ে যাচ্ছে। লালবানুর লজ্জা দ্বিগুন বেড়ে যায়। আলতাফ খাঁ একবার লালবানুর দিকে তাকিয়ে চলে যায়। ফরিদা বেগম আসতে, মালেকা বেগম দুই বউকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে চলে যান। লালবানুকে মনমরা অবস্থায় দেখে ফরিদা জিজ্ঞেস করে,“কি হয়েছে?”


“কিচ্ছু না।”

লালবানু হাসার চেষ্টা করে। ফরিদা বেগম কথা বাড়ায় না। সে রান্নার কাজে লেগে পড়ে। লালবানু নিজ থেকে তাকে জিজ্ঞেস করে,“কি কি করবো?”


ফরিদা বেগম লালবানুকে কাজ বুঝিয়ে দেয়। মামার বাড়িতে কাজকর্ম করায়, এসব সাংসারিক কাজে লালবানু বেশ অভ্যস্ত। তাই তার কাজের ভুল খুঁজে পায় কম ফরিদা। কাজের এক ফাকে ফরিদা জিজ্ঞেস করে,“মাজেদ খাঁ তোমারে রোজ রাতে আদর করে?”


“আপনের না ভাসুর লাগে। তাইলে নাম ধইরা বলেন কেন?”

লালবানুর এমন কথায় ফরিদা চুপ হয়ে যায়। সে মনেমনে বলে,“মেয়ে যথেষ্ট বড়। আমি ছোট ভাবছি।”


লালবানু জবাব না পেয়ে নিজের কাজে মনোযোগ দেয়। ফরিদা বেগম আর কথা বাড়ায় না। সেও চুপচাপ নিজের কাজ করে যায়।

__

নিলুফা গ্রামের পথ দিয়ে ধীরে ধীরে স্কুলের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। স্কুলে যাবার পথে একটি চায়ের দোকান পড়ে। নিলুফা যাবার সময় সেদিকটা আড়চোখে তাকায়। কাউকে দেখতে না পেয়ে একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সেই সময়ে নিলুফা কারো বুকে মৃদু ধাক্কা খায়। নিলুফা মাথা তুলে তাকায়। তার সামনের মানুষটাকে দেখে ভয় পেয়ে পিছিয়ে যায়। সুলতান মিষ্টি এক হাসি উপহার দিয়ে বলে,“ভয় পাইছো?”


নিলুফা জবাব দেয় না। সুলতান একধ্যানে তার সামনে থাকা পরীটাকে দেখে নেয়। পরীর উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের গড়ন, ডাগর ডাগর দু'টি চোখ। কিছুটা মোটা অধর। যেটা হালকা গোলাপি বর্নের। সবকিছু মিলিয়ে তার সামনে পরী দাঁড়িয়ে আছে। যাকে দেখে সে সবসময় মুগ্ধ হয়। নিলুফার কাছ থেকে জবাব না পেয়ে সুলতান পুনরায় জিজ্ঞেস করে,“ভয় পাইছো নিলু?”


“হ্যাঁ।”

নিলুফার স্পষ্ট জবাব। সুলতান অবাক হয়ে বলে,“এইখানে ভয় পাওয়ার মতো কি ঘটলো?”


নিলুফা জবাব না দিয়ে সুলতানকে এড়িয়ে চলে যায়। সুলতান তার যাবার পানে তাকিয়ে ম্লান হাসে। 

*

সেদিন নিলুফা বাসায় ফিরে হতভম্ব হয়ে যায়। তার বাবা বেঁচে নেই। গ্রামের দক্ষিণ দিকের বনে তার মৃত/দেহ পাওয়া গেছে। নিলুফা এবং তার মা জাহানারা কান্নায় ভেঙে পড়ে। কেউ ছু/রি দিয়ে কুপিয়ে নিলুফার বাবাকে হ/ত্যা করেছে।

__

ইতিমধ্যে খবরটি খাঁ বাড়ি এসে পৌঁছায়। গ্রামের রফিক সিকদার মা/রা গেছে। ফরিদা বেগম খবরটি শুনে কেমন অস্বাভাবিক হয়ে গেল। তার চোখেমুখে কিসের একটি ভয় ফুটে উঠেছে? আলতাফ ফরিদাকে লক্ষ্য করে অবাক হয়ে যায়। সে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করে,“তুমি এত ভয় পাচ্ছো কেন?”


ফরিদা জবাব না দিয়ে ঘরে চলে যায়। লালবানু বাড়ির সবার দিকে কৌতূহল চোখে তাকিয়ে আছে।

*

রাতের বেলা মাজেদ বাড়ি ফিরলে লালবানু তাকে খাবার দেয়। মাজেদ খাবার খেয়ে নিজের ঘরে চলে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে লালবানুও চলে আসে। তাকে দেখে মাজেদ বলে,“দরজা বন্ধ কইরা কাছে আসো।”


লালবানু দরজা বন্ধ করে, ধীরে ধীরে মাজেদের কাছে আসে। মাজেদ তাকে আলিঙ্গন করে। লালবানু মনে সাহস জুগিয়ে বলে,“রফিক সিকদার কে?”


মাজেদ কিছুটা অবাক হয়। পরক্ষণে নিজেকে সামলে নেয়। তারপর বলে,“গ্রামের একজন। আইজ মা/রা গেল। তুমি তার কথা জানতো চাইতাছো কেন?”


“আসলে..।”


“কি?”

লালবানু ভেবে পাচ্ছে না কথাটি মাজেদ খাঁয়ের কাছে বলবে নাকি বলবে না। মাজেদ খাঁ পুনরায় জিজ্ঞেস করে,“কি হইছে?”


“ভাবী তার খু/ন হওয়ার খবর শুইনা ঘর থেইকা বাইর হইতাছে না। আর...।”


“আর?”


“আমি যহন তারে ডাকতে গেছিলাম তহন সে আমারে ভীষণ ভয় পাচ্ছিলো।”


মাজেদ খাঁ কথাটি শুনে ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়ে। লালবানু মাজেদের মুখের পানে তাকিয়ে আছে। তার ভাবভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করছে। মাজেদ ম্লান হেসে লালবানুকে পুনরায় আলিঙ্গন করে বলে,“ওসব কিচ্ছু না। তুমি তারে নিয়া ভাইবো না। আসো কাছে আসো।”


এটা বলে মাজেদ লালবানুকে কাছে টেনে নেয়। লালবানু তাতে স্বায় দেয়। মাজেদ লালবানুর কপালে চুমু খেয়ে একপলক তার দিকে তাকায়। মনেমনে বলে,“মেয়েটা বড্ড আবেদনমই।ছোট্ট বোঝা যায় না।”

*

লালবানু মালেকা বেগমের হাতে পান বানিয়ে দিয়ে বলে,“নেন আম্মা।”


“সুপারি জর্দা ঠিকভাবে দিছো তো?”

মালেকা বেগম শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে। লালবানু মাথা নাড়িয়ে বলে,“হ্যাঁ।”


“ভালো। সংসারে ভুলচুক যত কম হইবো ততই ভালো।”

লালবানু মাথা নাড়ায়। মালেকা বেগম পুনরায় বলে,“শোনো বউ। তুমি এই বাড়ির বড় বউ। তোমারে সেই মতো চলতে হইবো। সংসারটা সামলাইতে শিখতে হইবো। এই বাড়ির বড় বউ হওয়া মেলা দায়িত্বের। সেইসব পালন করতে হইবো তো।”


লালবানু আবারও মাথা নাড়ায়। এই সময়ে ফরিদা বেগম ঘরে আসে। নরম গলায় বলে,“আম্মা ডাকছিলেন?”


“হয়।”

মালেকা বেগম লালবানুর দিকে তাকায়। লালবানু উঠে চলে যেতে নেয়, সেই সময়ে ফরিদা বেগমে গালে লালচে দাগ দেখে দাঁড়িয়ে যায়। কৌতূহলবসত জিজ্ঞেস করে,“ভাবী আপনেরে মার/ছে কে?”


“কে মা/রবে। কই না তো।”

বেশ ইতস্ততবোধ করে ফরিদা বেগম বলে। লালবানু অবাক চোখে তাকে দেখে। কাল রাত অব্দি সে ঘর থেকে বের হয়নি। কেউ ডেকেও বের করতে পারেনি। আজ সকাল হ'তে না হ'তে একা একা আসলো। সেই সাথে সবার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করছে। দেখে মনে হয় না, কালকে কিছু হয়েছে। লালবানু লালচে দাগটি দেখিয়ে বলে,“এইখানে লাল হইয়া আছে। তাই দেইখা মনে হইলো কেউ থাপ্পড় মারছে।”


“আরে না। ভাবী তুমি ভুল ভাবছো।”

মালেকা বেগম কিছুটা কঠিন গলায় বলে,“সংসারে মেলা কিছু ঘটে। সব বিষয়ে নাক গলাইতে নাই বড় বউ।”


লালবানু মাথা নাড়িয়ে চুপচাপ চলে যায়। ফরিদা বেগম মালেকা বেগমের চোখের দিকে তাকায়। মালেকা বেগম স্পষ্ট গলায় বলে,“রফিক হর/দারের লগে তোমার কি সম্পর্ক? যে তার মৃ/ত্যুতে শোক পালন করলা।”


“কিসের সম্পর্ক?”

ফরিদা বেগম বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করে। মালেকা বেগম পানের পিক ফেলে বলে,“কিসের সম্পর্ক সেইটা জানতে চাইছি।”


“কোন সম্পর্ক নাই আম্মা।”


“তাইলে তার মর/নে তোমার এত শোক কিসের?”


“আম্মা আমি তার জন্য শোক পালন করিনি। আমি আসলে....।”


মালেকা বেগম ফরিদা বেগমের দিকে জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকায়। ফরিদা বেগম কিছুটা ভয় পায়।

'

'

চলবে,

(কেমন হয়েছে? লেখার মান চলার মতো? মন্তব্য করে যাবেন)

Post a Comment

Previous Post Next Post