Top News

পর্বসংখ্যা-(০৫) আনারকলি

 #আনারকলি 

#মেহেরিন_আনজারা_নিশা 

#পর্বসংখ্যা-(০৫)

________________________


কিছুক্ষণ পর এক মগ কফি নিয়ে ঢুকে। কাঁপা কাঁপা হাতে এগিয়ে ধরলো। আফ্রিদ অনামিকার হাতের দিকে তাকায়,ঠকঠক করে মগটা কাঁপছে!


"এতো ভয়?"


ভয়ার্ত চোখে তাকালো অনামিকা। চোখে-মুখে কেমন অসহায়ত্বের ছাপ! আফ্রিদ তাকিয়ে রইলো।


"আপনার কফি।"


আচমকা মগটা নিয়ে অনামিকার হাতে ঢেলে দিলো গরম কফি। চিৎকার করতে নিলে মুখ চেপে ধরলো,চিৎকার করতে দিলো না। চিৎকার করতে না পেরে আচমকা জ্ঞান হারালো অনামিকা। বাবুকে কোলে নিয়ে আফরা এলো রুমে। দেখলো সেন্স হারিয়ে ফ্লোরে পড়ে আছে অনামিকা। একপ্রকার ছুটে এলো।


"কী করেছো ভাবিকে?"


"তুই এখানে কেন?"


"কী করেছো তুমি?"


"সামনে থেকে যা।"


আফরা গেল না,অনামিকাকে পছন্দ করে না তা ঠিক; কিন্তু তাই বলে ভাইয়ের অমানবিক আচরণ মানতে পারলো না। দেখলো ডানহাতে ফোস্কা ফুটেছে। কেমন টকটকে লাল। আঁতকে উঠলো আফরা।


"গরম কফি ঢেলেছো তাই না?"


কিছু বললো না আফ্রিদ।


"কী করেছো ও?"


মাকে ডেকে আনলো আফরা। একপ্রকার ছুটে আসেন তিনি। অনামিকাকে ফ্লোরে এবং ফোস্কা হাত দেখতেই হিতাহিতজ্ঞান ভুলে আচমকা কষিয়ে একটা থাপ্পড় মা'র'লে'ন ছেলের গালে,হতভম্ব হয়ে গেল আফ্রিদ।


"কেন করলে এটা?"


"ঠিকমতো করেছি।"


"পৃথিবীর বুকে নারী হলো পুরুষের জন্য বড় নিয়ামত। এরকম নিয়ামত আর কিছুই হয় না। আর তুমি একের পর এক যন্ত্রণা দিয়েই যাচ্ছো!"


আগুন চোখে তাকালো আফ্রিদ।


"তুমি যদি আমার মা হতে তাহলে আজ এমন মেয়েকে আমার সাথে বিয়ে.."


কষিয়ে আরেকটা থাপ্পড় মা'র'লে'ন।


"একদম মুখ বন্ধ! কোনো কথা নয়।"


ফণা তোলা সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করছে আফ্রিদ। অনামিকার জন্য খুব খারাপ লাগলো আফরার। নিশ্চয়ই সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারিয়েছে। চোখের কোন বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে! বাবুটা তার কোলে হাসছে! যদি বুঝতে পারতো তার মায়ের কষ্ট তাহলে কি করতো বাবুটা? মনখারাপ হয়ে গেল আফরার। আইস ব্যাগ এনে হাতে দিতে লাগলো। আচমকা চেঁচিয়ে উঠলো আফরা।


"কেমন ভাই তুমি আমার? কিভাবে পারলে একটা এতিম মেয়ের উপর এমন বর্বর নির্যাতন করতে?একবার,দু'বার তিনবার! কয়বার করছো তুমি?"


ফুঁসতে লাগলো আফ্রিদ।


"এই মেয়ে একটা সুবিধালোভী!"


ক্ষিপ্ত হলেন মাহরীন খাতুন।


"যে পুরুষ নারীর সম্মান নিয়ে খেলে সে কোনোদিন পুরুষ হয়ে উঠার যোগ্য না!"


"পুরুষত্ব নিয়ে কথা বলবে না।"


"ও তো কাজ করছিলো,ওকে ডেকে এনে ওর সাথে এমনটা কেন করলে?"


"চরিত্রহীনা মেয়ে একটা।"


"কার সাথে কী করেছে?"


"পুরুষদের গা ঘেঁষা অভ্যাস।"


"তুমি সাধু?"


ক্ষুব্ধ হলো আফ্রিদ।


"এই সব রাগ-জিদ আমাকে দেখাবে না।"


বাসা থেকে বেরিয়ে যায় আফ্রিদ। একজন ডক্টর কল করে আনলেন মাহরীন খাতুন। অনামিকার প্রাথমিক চিকিৎসা করে মেডিসিন দিয়ে চলে গেলেন। নায়লা খাতুন এবং আফ্রিদির চাচী বুঝতে পারলেন না হঠাৎ কী হয়েছে অনামিকার! সকালের পর থেকে রুম থেকে বেরুতে দেখা গেল না। সারাক্ষণই রুমের ডোর বন্ধ করে রাখছে! তবে কিছু তো হয়েছে। মাহরীন খাতুন উনাদের জানালেন অনামিকা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে তার রেস্টের প্রয়োজন।


১১.

আফ্রিদির বিয়ে-বউ-বাচ্চার বিষয়টি কোনোভাবেই নিতে পারছেন না রায়হানা বেগম ও মিরা মাত্র এক সপ্তাহের জন্য বাবার বাড়িতে গিয়েছিলেন ভাতিজির বিয়ের অনুষ্ঠানে,বাসায় ফিরতেই শুনতে পান আফ্রিদ নাকি বছর খানেক আগে বিয়ে করে বাচ্চাও নিয়েছে আর সেই ব্যপারটি গোপন করে হুট করে বউ-বাচ্চা নিয়ে এসে বাবা-মাকে সারপ্রাইজ দিচ্ছে ব্যপারটা নিতে পারছেন না উনারা কেউ।


"মা আমি এখন কী করবো বলো তো,সহ্য হচ্ছে ওই মেয়েটাকে।"


"আপদ তাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে দাঁড়াও।"


"কীভাবে?"


মেয়ের কানে কানে শিখিয়ে দিলেন কীভাবে কী করতে হবে।


"পারবি না?"


"হুম।"


"আফ্রিদির চরিত্রে একবার কলঙ্ক লাগালেই দেখিস মেয়েটা ছেড়ে চলে যাবে।"


"ওই মেয়েটাকে তো এই বাসা থেকে আমি বের করেই ছাড়বো।"


আড়াল থেকে শুনতে পান মাহরীন খাতুন। ভাবতেও পারেননি আপন জা আর ভাতিজির এমন ভয়ংকর রূপ দেখতে পাবেন। ঠিক এর কিছুক্ষণ পর টলতে টলতে প্রায় বেশ রাত করে বাসায় ফিরলো আফ্রিদ। নেশা করা এবং রাত করে বাসায় ফেরা এটা তার পুরোনো অভ্যাস। রুমে ঢুকতে নিতেই আচমকা টান পড়লো হাতে। বিরক্ত হয়ে নিভু নিভু চোখে তাকায় আফ্রিদ। দেখলো সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে অনামিকা।


"আনারকলি! এ্যাই আনারকলি!"


আচমকা জড়িয়ে ধরলো আফ্রিদকে। চুপ হয়ে যায় আফ্রিদ। রুমে ঢুকাতে নিতেই আচমকা থাপ্পড় পড়লো রিয়ার গালে। হতভম্ব হয়ে যায় সে আর তার মা-মেয়ে দুজন।


"আনারকলিকে থাপ্পড় মা'র'লে কেন মা?"


"নেশাখোর ছেলে নিজের রুমে যাও বলছি।"


নিভু নিভু চোখে মায়ের দিকে তাকায় আফ্রিদ।


"আনারকলি এখানে।"


"নিজের রুমে যেতে বলেছি তোমায়।"


রিয়ার থেকে টেনে ছাড়িয়ে নিলেন ছেলেকে।


"এই আপনি আমাকে থাপ্পড় মা'র'লে'ন কোন সাহসে?"


"একটা অবিবাহিত মেয়ে হয়ে বিবাহিত পুরুষের দিকে নজর দিতে লজ্জা করে না তোমার?"


"লজ্জা তো আপনার করা উচিত।"


কষিয়ে আরেকটা থাপ্পড় মা'র'লে'ন। রায়হানা বেগম এগিয়ে এলেন।


"আপনি আমার মেয়ের গায়ে হাত তুললেন কেন ভাবি?"


"তো কি চুমা দিবো?"


"আপনি আমার মেয়ের গায়ে হাত তুলতে পারেন না।"


আড়াল থেকে ব্যপারটা লক্ষ্য করলো আফরা। সেও এগিয়ে এলো।


"তোকে এতদিন ভালো জানতাম রিয়া,কিন্তু তুই আজ তোর চূড়ান্ত রুপ দেখিয়ে দিলি।"


"এখনও কিছুই দেখাইনি।"


মাহরীন খাতুন বললেন,"আমার ছেলের বউ-বাচ্চা থাকার পরেও কীভাবে এমন জঘন্য কাজ করতে নিলে?তোমার সাহস তো কম নয়!"


"আফ্রিদ ভাইয়াকে আমি ভালোবাসি আপনি কি জানতেন না?"


"আমার ছেলে তোমাকে ভালোবাসে?"


"একজন বাসলেই হলো।"


"লজ্জা করে না এইসব কথা বলতে?"


"লজ্জা করবে কেন?"


"অনামিকার শাড়ি,গয়নাগাটি চুরি করে এনেছো কেন?"


"প্রয়োজন হয়েছিলো তাই।"


"চোরের মায়ের বড় গলা।"


"ওই অনামিকাকে এই বাড়ি থেকে বের করেই ছাড়বো আমি।"


মাহরীন খাতুন নিজের মেয়েকে বললেন,"এখন বুঝতে পেরেছো কার সাথে এতদিন মিশেছো! আর তুমিও শোনো,এই বাড়িটা আমার। আফ্রিদির না,আফ্রিদির বাবারও না। আমার বাড়িতে কে থাকবে আর কে থাকবে না সেটা ডিসাইড করবো আমি তুমি না।"


"আমিও দেখে নিবো।"


"শোনো,যারা নির্দিষ্ট কোন উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে অন্যের জীবনে প্রবেশ করে কারো জীবনের শান্তি কেড়ে নেয় তাদের জীবনের কোন ভালো পরিকল্পনা কখনোই পূরণ হয় না। তোমারও হবে না দেখে নিও।"


ছেলেকে নিয়ে এলেন রুমে। নেশা করে এসেছে আজ আবারও।


"তোকে আমার চাচাতো বোন ভাবতেও ঘৃণা হচ্ছে রিয়া।"


চেঁচামেচির শব্দে রুম থেকেই সব দেখলো নাদিয়া। কীভাবে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না কিছু। রিয়ার সাথে তার সম্পর্ক ভালো না। তার এই বাড়িতে আসাটাও রিয়ার পছন্দ না। আফ্রিদকে নিয়ে রুমে ঢুকলেন মাহরীন খাতুন। অনামিকা জেগেই ছিলো। হাতের ব্যথায় ঘুমাতে পারছে না,টনটন করছে!


"অনামিকা ও নেশা করে এসেছে আজ আবারও। ওকে সামলাও।"


আফ্রিদির দিকে তাকাতেই ভয়ে গুটিয়ে গেল। চোখ-মুখ কেমন লাল! বুঝাই যাচ্ছে মারাত্মক নেশা করেছে।


"শেষবারের মতো তোমাকে বলছি,নিজের স্বামীকে আঁচলে বাঁধো। তোমার শত্রুরা তাদের কাজে নেমে পড়েছে।"


আতঙ্কিত হলো অনামিকা।


"ওকে ধরো ফ্রেশ করাও। এরপর কী করবে তুমি ভালো জানো। মনে রেখো,তোমার যাওয়ার সকল পথ বন্ধ। তাই ওকে কীভাবে আঁচলে বেঁধে সংসার রক্ষা করবে সেটা তোমার দায়িত্ব।"


দাঁড়াতে পারলো না আফ্রিদ শুয়ে পড়লো। মাহরীন খাতুন চলে গেলেন। ভীষণ রাগ হচ্ছে রিয়ার উপর। কতো বড় সাহস মেয়েটার! সাহস দেখে অবাক হচ্ছেন তিনি। যার খাচ্ছে,যার বাসায় থাকছে তার সাথেই স্বর উঁচিয়ে কথা বলছে! এই বাসা থেকে বের করে দিলে কোথায় গিয়ে উঠবে সেই বিবেক আছে?একদম ফুটপাতে থাকতে হবে,সেই মেয়ের আবার বড় গলা। এদিকে কতক্ষণে অনামিকার শাড়ি,গয়নাগাটি চুরি করে নিয়ে গিয়েছে। অথচ অনামিকার খবর নেই। এখন থেকে সাবধানে রাখতে হবে সব। আর অনামিকাও যে কি! তপ্তশ্বাস ফেললেন। এত বোকা মেয়েরা হলে কীভাবে হবে?বোকা দেখেই লাঞ্ছিত হতে হয়েছে অসংখ্যবার!

________


চলবে~

Post a Comment

Previous Post Next Post