Top News

পর্বসংখ্যা-(০৪) আনারকলি

 #আনারকলি 

#মেহেরিন_আনজারা_নিশা 

#পর্বসংখ্যা-(০৪)

________________________


টুকটাক শ্বাশুড়ির হাতে হাতে সব গুছিয়ে ভয়ে ভয়ে রুমে ঢুকতেই দেখলো আফ্রিদ সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।।ঘাবড়ে গেল অনামিকা।


"ইয়াং ছেলেদের দেখলে খুব হাসি পায় তোর তাই না?"


ভয়ে গুটিয়ে গেল অনামিকা।


"আসলেই.."


শক্ত করে চিবুক চেপে ধরতেই আর্তনাদ করে উঠলো অনামিকা।


"চিরদিনের জন্য হাসি গায়েব করে দিবো।"


ছুঁড়ে মা'র'তে'ই ফ্লোরে দিয়ে পড়লো। শুয়ে পড়লো আফ্রিদ। আজও বাচ্চাকে মাঝখানে দিয়েছে অনামিকা। কাল রাতে একবার দূর্ঘটনা ঘটেছে।


"ওকে ওইপাশে দাও।"


"নিচে পড়ে যাবে।"


"দিতে বলেছি।"


বাবুকে ওইপাশে দিয়ে লাইট অফ করে মাঝখানে শুয়ে পড়লো অনামিকা। খুব ভয় করছে আবার কখন না জানি বেল্ট দিয়ে মা'রা'মা'রি শুরু করে। জড়োসড়ো হয়ে বাবুর দিকে চেপে শুয়ে রইলো। কিন্তু ঘুম আসলো না আফ্রিদির। সারারাত অনামিকার শরীর থেকে আসা বেলীফুলের সুবাসে দম আঁটকে রইলো। কেন জানি সরিয়ে দিতেও মন চাইলো না। ঘুমের ঘোরে আফ্রিদির দিকে চেপে আসলো। বেলীফুলের সুবাস আরো তীব্র হলো। শ্বাস আঁটকে রইলো আফ্রিদ। এতো কাছে দু'জন যে তার অনার্য ইচ্ছেয় ডুব দিতে মন চাইলো। ইচ্ছে করেই অনামিকাকে সরিয়ে দিলো না। ঘুম ভারী হয়েছে অনামিকার,তাই আস্তে আস্তে বেলীফুলের মালাগুলো খুলে রাখলো ড্রেসিং টেবিলের উপর। তবুও সুবাস মিইয়ে গেল না।


০৯.

সকাল হতেই জেগে যায় অনামিকা। বাবুটাকে পরিষ্কার করে খাইয়ে-দাইয়ে শ্বাশুড়ি মায়ের কাছে চলে গেল। সবাই নাস্তা করতে বসেছে। অনামিকাকে রাতের শাড়িতে দেখতেই মাহরীন খাতুন একপাশে টেনে নিয়ে গেলেন।


"শাওয়ার নাওনি,রাতের শাড়ি পরনে যে?"


"আসলেই.."


"আফ্রিদির সাথে কিছু হয়নি তোমার?"


কিছু বলতে পারলো না অনামিকা। তবে অস্বস্তি ফিল করলো। কালরাতে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে-গুছিয়ে দিয়েছেন অনামিকাকে,যা চোখের পড়ার মতো। আর কেউ হলে তো ঝাঁপিয়ে পড়তো মেয়েটার উপর। নিশান তো চোখ ফেরাতে পারছিলো না।


"শোনো,মেয়েদের প্রতিদিন সকালে গোসল করা উচিত।"


"আসলেই.."


"যদি কখনো দেখা যায় সংসারে শ্বাশুড়ি,ননদ এবং স্বামীর আত্নীয়-স্বজন কোন নারীর সংসার ভাঙ্গার চেষ্টা করেছে,তখন তাদের টাইট দেওয়ার জন্য রাতে স্বামীর সাথে কিছু হোক বা না হোক প্রতিদিন সকালে গোসল করবে তাদের দেখিয়ে দেখিয়ে। তখনই তারা বুঝে যাবে এতকিছু করার পরেও তোমার সংসার ভাঙ্গা সম্ভব না।"


"আমার সংসার কে ভাঙ্গবে?"


"শীঘ্রই দেখবে।"


আতঙ্কিত হলো অনামিকা।


"যাও বাবুটাকে আমার কাছে দিয়ে দ্রুত গোসল সেরে আসো।"


বাবুকে দিয়ে রুমে যেতে নেয়।


"শোনো।"


"বলুন।"


"সবসময়ই সেজেগুজে থাকবে। নতুন নতুন শাড়ি পরবে। কিছুর দরকার হলে আমাকে বলবে।"


মাথা নাড়ায় অনামিকা।


"পুরুষ মানুষ নারীকে সবসময়ই পরিপাটি হিসেবে দেখতে চায়। যে পুরুষ ঘরে শান্তি পায় সে কখনো বাইরে শান্তি খোঁজে না। তাই সবসময় সেজেগুজে পরিপাটি হয়ে থাকবে। বুঝেছো?"


"বুঝেছি।"


"তোমার কিন্তু সামনে অনেক বিপদ অনামিকা।"


ঘাবড়ে যায় সে।


"কেন?"


"আস্তে আস্তে দেখতে পাবে এখন আফ্রিদির মন যোগাতে হবে তোমার,যাও এখন।"


দ্রুত শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে এলো অনামিকা। ঠিকমতো চুলগুলো মুছেনি। নতুন শাড়ি পরে মাথায় ঘোমটা দিয়ে শ্বাশুড়ির কাজে হাত মিলালো। কিছুক্ষণ পর বাবুটা ঘুমিয়ে গেল মাহরীন খাতুনের কোলে।


"ওকে শুইয়ে দিয়ে আসো।"


ঠিকঠাক মতো শুইয়ে চলে আসে অনামিকা। আবারও কাজে হাত লাগায়। হাত-মুখ ধুয়ে নিশান নাস্তা করতে এলো। অনামিকার দিকে চোখ পড়ে। ব্যস্ত হয়ে কাজ করছে! গোসল করায় স্নিগ্ধ লাগছে! লম্বা লম্বা চুলগুলো থেকে পানি ঝরছে! মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইলো নিশান। মেয়ে মানুষের চুল থেকে পানি ঝরলেও বুঝি এতো সুন্দর লাগে। ব্যপারটা লক্ষ্য করলো আফরা। খুবই জেলাশফিল হলো অনামিকার প্রতি। নিশানকে সে পছন্দ করে। যদিও নিশান জানে না। ভালো লাগলো না অনামিকাকে। আফ্রিদ উঠে একেবারে শাওয়ার নিয়ে তৈরি হয় একটু বাইরে যাবে ঘুরতে। দেখলো বাবুটা জেগে গেছে। বুকের ভর দিয়ে সমানে কাঁদছে! বেডের কিনারায় চলে এসেছে। আফ্রিদ ধরলো না। রুম থেকে বেরিয়ে ডাইনিংয়ে তাকাতেই দেখলো নিশান তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে অনামিকাকে। কিন্তু অনামিকার খবর নেই।


"আনারকলি! এই আনারকলি!"


"কাকে ডাকছো আফ্রিদ?"


"আনারকলি কই?"


"আনারকলি কে?"


"আনারকলিকে চেনো না কাহিনি করছো?"


হতভম্ব হলেন মাহরীন খাতুন। সত্যি তিনি আনারকলিকে চিনেন না।


"আনারকলিকে বলো তার ছেলে কাঁদছে!"


আফ্রিদির কথা শুনতেই চমকে উঠে অনামিকা।


"কোন আনারকলির ছেলে?"


এগিয়ে আসে অনামিকা।


"আমাকে বলছেন উনি।"


"ওহ! বাবুকে নিয়ে আসো যাও।"


বাবুকে আনতে যায় অনামিকা। নায়লা খাতুন বললেন,"আফ্রিদ এটা কেন বললো আপা?"


"কোনটা?"


"বললো যে আনারকলির ছেলে আর তোমরা আনারকলিকে চেনো না?"


মৃদু হাসলেন তিনি।


"বুঝোনি নায়লা! ছেলে তার বউকে ভালোবেসে আনারকলি বলে ডাকে।"


"তাহলে বললো যে তার ছেলে কাঁদছে?"


"নিশ্চয়ই মান-অভিমান হয়েছে তাই এমনটা বলেছে। আফ্রিদ কিন্তু তার ছেলেকে খুব ভালোবাসে। অভিমান থেকেই হয়তো এমনটা বলেছে।"


আর কেউ সন্দেহ করলো না ওদেরকে। স্বস্তির শ্বাস ফেললেন মাহরীন খাতুন। কিছুক্ষণ পর বাবুকে নিয়ে এলো অনামিকা,কিন্তু কোলে থাকতে চাইছে না। মাহরীন খাতুন কোলে তুলে নিলেন।


"কফি বানাতে পারো অনামিকা?"


মাথা নাড়ায়।


"তুমি বরং সবাইকে কফিটা বানিয়ে দাও আমি বাবুকে কোলে রাখছি!"


"আচ্ছা!"


বাবুকে আদর করতে লাগলেন তিনি। কফি বানাতে লাগলো অনামিকা।


"ভাবী আমি কফিতে চিনি কম খাই। আমারটা একটু ভালো করে বানিও।"


মৃদু হাসলো অনামিকা।


"আচ্ছা!"


মুগ্ধ নয়নে নিশান তাকায়। শুনতে পায় আফ্রিদ,সেও বসেছে সবার সাথে। খেয়ে ড্রয়িংরুমে গিয়ে বসলো। আফ্রিদকে দেখতেই তার কোলে যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি লাগালো বাবুটা। দেখেও না দেখার ভান করলো আফ্রিদ। জাস্ট বিরক্তকর একটা বাচ্চা! আচমকা আফ্রিদির কোলে আফিফকে তুলে দিলেন মাহরীন খাতুন।


"বাবুকে নাও। তোমাকে দেখে আসতে চাইছে!"


চোয়াল শক্ত করলো আফ্রিদ। অনামিকা আর তার ছেলেকে সহ্যই করতে পারে না সে। যতই দূরে থাকতে চায় ততই কাছে এসে ভিড়ছে! ডিজগাস্টিং!


"আনারকলিকে বলো তার ছেলেকে কোলে নিতে।"


"আফ্রিদ!"


চোখ পাকালেন তিনি। আসলেই বাচ্চাটা আফ্রিদকে দেখে বার-বার আসতে চাইছে,বুঝেও আফ্রিদ নীরব রয়েছে।


"বাচ্চার সাথে কি! বাচ্চার মায়ের সাথে যা ইচ্ছে তাই! বাচ্চার সাথে কিছু না! বাচ্চাদের সাথে ফেরেশতা থাকে।"


নিশান এসে পাশে বসলো। আফিফের ফুলো ফুলো গালগুলো টিপে টুপটুপ করে অনেকগুলো চুমু খেলো।


"বাচ্চাটা খুব কিউট ভাইয়া,ঠিক তোমার মতো। ইচ্ছে করে ওর মাকে শুদ্ধ ওকে নিয়ে যেতে।"


চোয়াল শক্ত রাখলো আফ্রিদ। কার না কার বাচ্চা এখন তাকে বাবা বানাচ্ছে! সব তার মায়ের কারণে হচ্ছে! এদিকে নিশান ছ্যাঁছড়ামো করছে কেন এক বাচ্চার মায়ের জন্য?এটা কেমন ভদ্রতা?


"ভাবি আমি এখানে কফিটা দিয়ে যাও।"


আফ্রিদির কোলে উঠে বাবুটা খেলতে লাগলো। নিশান হাত পাতলো গেল না,বরং কেঁদে উঠলো। আফ্রিদির নাম-মুখ সব চাটতে লাগলো। বিরক্ত হলেও চুপ রইলো,বাচ্চা পছন্দ করে না আফ্রিদ। আফ্রিদির দুগালে চাটতে লাগলো এবার। আচমকা নাক চুষতে লাগলো। বিরক্ত হলেও চুপ রইলো। আচমকা ছোট্ট ছোট্ট দাঁত দুটো দিয়ে কামড় দিলো নাকে। আর্তনাদ করে উঠলো আফ্রিদ। শব্দ করে হেসে ফেললো নিশান। কফি নিয়ে আসে অনামিকা। দেখলো নাক ঢলছে আফ্রিদ। বাচ্চাটা মজা পেয়েছে যেন। কামড়ে সেখানে চাটতে লাগলো। এবার গাল চাটতে লাগলো,ধৈর্যের লিমিটেশন ক্রস করলো বাবুটা।


"ভাইয়া আপনার কফি।"


"বাবু কী করে দেখো ভাবি।"


দেখলো আফ্রিদির নাকে চিরল চিরল দাঁতদুটো বসিয়ে দিয়েছে; আতঙ্কিত হয় অনামিকা।


"দুঃখিত! ও ছোট্ট মানুষ বুঝতে পারেনি। আমার কাছে দিন।"


"কফি খাবো,এক মগ কফি নিয়ে রুমে আসো।"


ভয়ে ভয়ে অনামিকা কফি বানাতে যায়। আফ্রিদির চাহনি অস্বাভাবিক লাগলো। বুকটা ধুকপুক করতে লাগলো।


"আফরা!"


"বলো ভাইয়া।"


"বাবুটাকে কোলে নে।"


আফিফকে কোলে তুলে নেয় আফরা। অনামিকাকে পছন্দ না হলেও বাবুটাকে ভালো লাগে। যেতেই চাইলো না বাবুটা। আফ্রিদির কাঁধ ধরে দাঁড়ায়,আবারও নাক চুষতে লাগলো। গলা জড়িয়ে ধরে দু-হাত দিয়ে পা পা করতে লাগলো। মনে মনে বলল,"বড্ড সেয়ানা এই আনারকলি! ছেলেকে পাপা ও শিখিয়েছে!"


রুমে চলে যায় আফ্রিদ।

_______


চলবে~

Post a Comment

Previous Post Next Post