পর্ব ৬: সত্যের সন্ধান
লালবানু গভীর চিন্তায় নিমগ্ন। তার মনে ক্রমশ এক ধরনের সংশয়ের আবির্ভাব হইতে লাগিল। এই সংসারে, এই পরিবারের মধ্যে এমন কোনও গোপন রহস্য লুক্কায়িত, যাহার মূলে নিহিত রহস্যের গভীরতা সে অবধারিতরূপে অনুধাবন করিতে পারিতেছে না। তবে সে একথা বোধ করিল, যে তাহাকে ইহার সন্ধানে নামিতে হইবে।
রাত্রি গভীর। সকলেই নিদ্রামগ্ন। লালবানু ধীরে ধীরে উঠিয়া পড়িল। সে মনে মনে স্থির করিয়াছে, আজ সে ফরিদা বেগমের সহিত আরও কথা বলিবে। সে জানে, ফরিদা বেগমের নিকট আরও অনেক কথা লুক্কায়িত রহিয়াছে, যাহা প্রকাশিত হওয়া একান্ত আবশ্যক।
সে ফরিদা বেগমের ঘরের দ্বারে গিয়া সুকোমলভাবে আঘাত করিল। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলিল, এবং ফরিদা বেগম সঙ্কুচিত দৃষ্টিতে বাহিরে আসিল।
"এত রাতে?" ফরিদা বেগম জিজ্ঞাসিলেন।
লালবানু সংক্ষেপে বলিল, "ভাবী, আমি আর সহ্য করিতে পারিতেছি না। তুমি যাহা কিছু জানো, আজ আমাকে সমস্ত বলিতে হইবে।"
ফরিদা বেগম প্রথমে কিছুক্ষণ স্থবির থাকিলেন। তাহার মুখমণ্ডলে এক অজানা শঙ্কার ছাপ ফুটিয়া উঠিল। অবশেষে তিনি লালবানুকে ঘরে প্রবেশ করাইলেন এবং দরজা বন্ধ করিলেন।
"কী জানিতে চাও?" ফরিদা বেগম ক্ষীণস্বরে বলিলেন।
"মাজেদ খাঁ এবং রফিক সিকদারের মধ্যে কী ঘটিয়াছে? আমি বোধ করি, তোমার নিকট আরও কোনও গূঢ় তথ্য রহিয়াছে, যাহা তুমি বলিতেছ না।"
ফরিদা বেগম এক মুহূর্ত নীরব থাকিলেন। তারপর তিনি গভীর নিঃশ্বাস লইয়া বলিলেন, "রফিক সিকদার একজন সৎ ব্যক্তি ছিল। সে আমাদের গ্রামের মানুষদের অধিকারের জন্য লড়াই করিত। কিন্তু মাজেদ খাঁ এবং তাহার সহযোগীরা গ্রামবাসীর জমি ও সম্পত্তি কেড়ে লইতে শুরু করিল। রফিক তাহাদের বিরোধিতা করিল। এই জন্যই তাহাকে সরাইয়া দিতে হইল।"
লালবানুর হৃদয়ে বেদনার ঝড় উঠিল। সে কঠিনভাবে বলিল, "তবে কি মাজেদ খাঁ খুন করিয়াছেন?"
"হ্যাঁ," ফরিদা বেগম মৃদুস্বরে বলিলেন, "তাহারই আদেশে রফিককে হত্যা করা হইয়াছে।"
লালবানু অবাক হইয়া এক স্থানে দাঁড়াইয়া রহিল। এই সত্য তাহাকে স্তব্ধ করিয়া দিল। কিন্তু সে জানে, এত সহজে সে ভাঙিয়া পড়িবে না। এখন তাহার কর্তব্য হইবে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়ানো।
"এখন আমি কী করিব?" লালবানু ভাবিয়া নিল। "এত বড় সত্য জানিবার পর, আমি কি এই সংসারের নিয়ম মানিয়া চলিতে পারিব? নাকি, আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করিব?"
ফরিদা বেগম তাহাকে সতর্ক করিয়া বলিলেন, "লালবানু, তুমি সতর্ক থাকিও। ইহারা অত্যন্ত শক্তিশালী। তাহাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াইতে হইলে সাহসের প্রয়োজন।"
লালবানু দৃঢ়কণ্ঠে বলিল, "আমি সাহস পাইয়াছি ভাবী। এখন আর ভয় পাইবার কিছু নাই।"
***
পরদিন সকালে, লালবানু তাহার পুরাতন বন্ধু নিলুফার সহিত দেখা করিবার জন্য বাহির হইল। নিলুফার পিতার রহস্যময় মৃত্যু এবং রফিক সিকদারের হত্যা—এই দুইয়ের মধ্যে কোনও যোগসূত্র রহিয়াছে কি না, তাহা জানিবার জন্যই সে নিলুফার সহিত আলোচনা করিতে চাহিল।
লালবানুর অন্তরে এখন এক দৃঢ় সংকল্প জন্মিতেছে। সে জানে, তাহাকে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে একা লড়াই করিতে হইবে। কিন্তু সে সাহস করিয়া সত্যের পথে চলিবার জন্য প্রস্তুত।
### চলবে...
**পর্ব ৬**-এ, লালবানু সত্যের সন্ধানে আরও গভীরে প্রবেশ করিতেছে এবং মাজেদ খাঁয়ের ষড়যন্ত্রের প্রকৃত সত্য প্রকাশিত হইতেছে। পরবর্তী পর্বে দেখা যাক, লালবানু কীভাবে এই জটিল রহস্য উন্মোচন করিবে।

Post a Comment