পর্ব ৪: লালবানু
রাত গভীর। খাঁ বাড়ি নিস্তব্ধ। শুধু দূরের পাখির ডাক আর মাঝে মাঝে বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ শোনা যাচ্ছে। কিন্তু লালবানুর ঘুম আসছে না। আলতাফ খাঁর কথাগুলো তার মাথায় বারবার বাজছে—"রফিক সিকদারের মৃ/ত্যু সাধারণ নয়।" তবে কি এই গ্রামের প্রভাবশালী মানুষগুলোর সাথে কিছু অন্ধকার সত্য জড়িয়ে আছে?
লালবানু বিছানায় উঠে বসে। তার মন বলছে, কিছু একটা ভয়ংকর সত্য তার সামনে রয়েছে, যা সে টের পাচ্ছে, কিন্তু বুঝতে পারছে না। আর এর কেন্দ্রে আছে তার ভাবী ফরিদা বেগম।
"এবার আমাকে ভাবীর কাছে গিয়ে সব জানতে হবে," মনে মনে ঠিক করে লালবানু। সে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হয়ে ফরিদা বেগমের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়।
***
ফরিদার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে লালবানু কয়েকবার হাত বাড়িয়েও কড়া নাড়তে পারল না। কিন্তু ভেতর থেকে আচমকা কান্নার মৃদু আওয়াজ ভেসে এলো। এই কান্না যেন গভীর, চাপা যন্ত্রণার। কিছুক্ষণ থেমে থেকে লালবানু কড়া নাড়ল। দরজা একটু ফাঁক হতেই ভেতর থেকে চমকে ওঠা ফরিদা বেগম বের হয়ে এলো।
"তুমি এখানে?" তার কণ্ঠে বিস্ময়।
"ভাবী, তোমার সাথে কিছু কথা আছে।" লালবানু শান্ত গলায় বলে।
ফরিদা কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। লালবানু হালকা ধাক্কা দিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল।
"ভাবী, এতদিন চুপ থেকেছি। কিন্তু আজ সত্যিটা জানতে চাই। তুমি কাকে ভয় পাচ্ছো? রফিক সিকদারের সাথে তোমার সম্পর্ক কী?" লালবানু দৃঢ়ভাবে প্রশ্ন করল।
ফরিদা বেগম প্রথমে কিছু বলতে পারল না। তার মুখে অসহায়তার ছাপ স্পষ্ট। কিছুক্ষণ পরে সে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল, “আমি… আমি আসলে তার সাথে আগে থেকেই পরিচিত ছিলাম। অনেক বছর আগে থেকে। তখন সে একদম অন্যরকম মানুষ ছিল। কিন্তু কিছু দিন পরে সে একদল লোকের সাথে মিশে গিয়েছিল, যারা গ্রামের সব অন্ধকার কাজ করে। আমি তাকে বহুবার এড়িয়ে চলেছি, কিন্তু সে আমাকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে।”
“তাহলে তার মৃ/ত্যুর সাথে তোমার ভয় কিসের?” লালবানুর প্রশ্ন আরও গভীর হয়।
ফরিদা ফিসফিস করে বলে, “কারণ আমি জানি, রফিক সিকদার শুধু খু/ন হয়নি, তার পেছনে আরও অনেক কিছু আছে। এই গ্রামের ক্ষমতাশালী লোকজন সেই ষড়যন্ত্রের অংশ। আমি সব কিছু জানি, কিন্তু বলার সাহস পাই না। বললে আমারও ক্ষতি হতে পারে।”
লালবানুর শরীরে শীতল স্রোত বয়ে যায়। এই গল্পের পেছনে যেন আরও বড় কোনো গোপন ষড়যন্ত্র রয়েছে।
“কিন্তু কারা এই সব করছে? কে এই ষড়যন্ত্রের পেছনে?”
ফরিদা একটু দ্বিধা করে বলে, “আমার ধারণা, এই কাজের পেছনে গ্রামের কিছু প্রভাবশালী লোক আছে। তার মধ্যে একজন হচ্ছেন তোমার শ্বশুর মাজেদ খাঁ। তিনি বাইরে শান্ত স্বভাবের মানুষ, কিন্তু তার ক্ষমতা আর লোকজনের ভয় তাকে বিপজ্জনক করে তুলেছে।”
লালবানু থমকে যায়। তার মন এখন একটা গভীর ধাঁধায় আটকে গেছে। শ্বশুর মাজেদ খাঁ? সে কীভাবে এতো বড় ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে? তার চারপাশের পৃথিবী যেন মুহূর্তেই পাল্টে যেতে থাকে।
***
পরদিন সকালে, লালবানু সবকিছু স্বাভাবিকভাবে সামলানোর চেষ্টা করলেও তার মনে গভীর সংশয় জমতে থাকে। মাজেদ খাঁকে সে কখনো এমন দৃষ্টিতে দেখেনি। সে সত্যিই কি এমন একজন মানুষ, যিনি এমন ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের নেতৃত্ব দিতে পারেন?
মালেকা বেগম তাকে কয়েকবার ডাকলেও, সে ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারছিল না। তার মনে কেবলই সন্দেহ জমছে—এখন কি তার আশেপাশের সবাইই তার শত্রু?
বিকেলে, যখন মাজেদ খাঁ বাইরে চলে যায়, লালবানু এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকে না। সে বাড়ির বাইরে বের হয়ে গ্রামের সেই দক্ষিণ দিকের বনের দিকে রওনা দেয়, যেখানে রফিক সিকদারের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল।
বনের ধারে এসে পৌঁছালে, লালবানু অনুভব করল, এখানে কিছু একটা গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে গেছে। হঠাৎ সে দূর থেকে কয়েকজন মানুষের ছায়া দেখতে পেল। তারা গাছের আড়ালে কথা বলছে।
লালবানু গাছের আড়ালে লুকিয়ে দেখার চেষ্টা করল, তাদের মধ্যে মাজেদ খাঁকেও দেখা গেল। তিনি গম্ভীরভাবে কারও সাথে কথা বলছেন।
লালবানুর বুক ধক ধক করতে থাকে। সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে শুনতে পেল, “রফিকের ব্যাপারটা ঠিকঠাক হয়ে গেছে। এবার বাকি কাজ শেষ করতে হবে।”
তার কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না লালবানু। তার নিজের স্বামী এত বড় ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত?
### চলবে...
**পর্ব ৪**-তে গল্প আরও গভীর হয়ে গেল। মাজেদ খাঁয়ের সাথে রহস্যময় ষড়যন্ত্রের যোগসূত্র প্রকাশিত হয়েছে, যা লালবানুকে আরও বিপদে ফেলে দিল। এখন দেখা যাক, পরবর্তী পর্বে লালবানু কীভাবে এই বিপদময় সত্যের মুখোমুখি হয়।

Post a Comment