#আনারকলি
#মেহেরিন_আনজারা_নিশা
#পর্বসংখ্যা-(০৩)
________________________
চোখ লেগে আসতেই আচমকা বাবুটা চিৎকার করে কেঁদে উঠলো,ধড়ফড়িয়ে জেগে উঠলো অনামিকা। দেখলো আফ্রিদির পিঠের নিচে চলে গিয়েছে বাচ্চাটা। আফ্রিদ নিজেও জেগে উঠলো কান্নার শব্দে। বিরক্ত নিয়ে অনামিকার দিকে তাকায়। আঁতকে উঠে অনামিকা এবং বাবুটাকে থামানোর চেষ্টা করে।
"ঘুমাতে দিবি না তোরা মা ছেলে? নাটক শুরু করেছিস রাতের বেলায়?"
"ব্যথা পেয়েছে বাবুটা,আমি থামাচ্ছি আপনি ঘুমান।"
চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে রইলো আফ্রিদ। ভয়ে গলা শুকিয়ে এলো অনামিকার,শুকনো ঢোক গিললো। বসে রইলো আফ্রিদ। খুব কান্না করতে লাগলো বাবুটা। মুখে দুধ দিলেও নিলো না। শুয়ে পড়লো আফ্রিদ,কিন্তু এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারলো না। রাগে-জিদে উঠে এসে আচমকা অনামিকার ঘাড়ের পেছন দিয়ে চুলের মুঠি চেপে ধরে গালে দুটো থাপ্পড় মা'র'লো।
"কার পাপ নিয়ে আমার ঘাড়ে ঝুলে পড়েছিস?"
অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকায়।
"ও কারো পাপ না।"
"মুখে মুখে তর্ক করছিস?"
কষিয়ে আরেকটা থাপ্পড় মা'র'লো। ভন ভন করতে লাগলো অনামিকার মাথা। বাবুটার কান্নার বেগ বাড়লো। ডুকরে কাঁদতে নিয়েও গিলে ফেললো।
"সারা রাত ঘুমাতে দিলো না।"
বাবুটাও আস্তে কাঁদছে না জোরে জোরেই কাঁদছে! অনেক কষ্টে মুখে দুধ দেওয়ার পর কান্না থামলো। তবে ভেতর থেকে কেঁপে কেঁপে একটা হিঁচকি আসছে। আহারে! বাবু বোধহয় ভীষণ ব্যথা পেয়েছে! বাম হাতটা ফুলে নীল হয়ে গেছে!
০৮.
নতুন বউ দেখার জন্য সন্ধ্যার দিকে আফ্রিদির মামী নায়লা খাতুন এবং মামাতো বোন নাদিয়া এসেছে বাসায়। অনামিকার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন মাহরীন খাতুন। অনামিকাকে ভালো লাগলো নায়লা খাতুনের। একে-তো মারাত্মক সুন্দরী তার উপরে চেয়েছিলেন উনার মেয়েকে এই বাড়ির বউ বানাবেন কিন্তু তার আগেই আফ্রিদি বিয়ে-শাদি করে সন্তানও জন্ম দিয়ে ফেলেছে ভাবতেই রাগ হচ্ছে আফ্রিদির উপর। অনামিকাকে সুন্দর করে সাজিয়ে-গুছিয়ে উনাদের সামনে উপস্থাপন করলেন। হঠাৎ আফ্রিদির মামাতো ভাই নিশান এলো আফ্রিদির বিয়ের কথা শুনতেই। সবাই সোফায় বসে কথা বলছে অনামিকা পাশে বসে রয়েছে তার বাবুটাকে কোলে নিয়ে।
"নিশান যে?"
"আমিও এসে পড়েছি ফুপি।"
"খুব খুশি হলাম,এমনিতেই তো আসতে চাও না।"
"নতুন ভাবিকে দেখতে চলে এলাম ফুপি।"
"খুব ভালো করেছো।"
সোফায় বসলো নিশান,হঠাৎ অনামিকার দিকে দৃষ্টি পড়তেই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো। আফ্রিদির বউ এতো সুন্দর হবে ভাবতে পারেনি। অনামিকার পাশে এসে বসতেই হকচকিয়ে উঠলো সে।
"ভাবি আমি আপনার ছোট দেবর।"
সৌজন্যমূলক মৃদু হাসলো অনামিকা। কিন্তু কিছু বললো না। উশখুশ করলো অনামিকার সামনে কথা বলার জন্য।
"বাবুটা কার ফুপি?"
"আফ্রিদির।"
"ওমা! শুনলাম বিয়ে করেছে বাচ্চার কথা তো শুনিনি।"
"আর বলো না ওরা বিদেশে লাভ ম্যারিজ করে ফেলেছে বাবু হওয়ার ছয়মাস পর বউ নিয়ে এসে আমাকে সারপ্রাইজ দিয়েছে।"
মাথা নিচু করে রাখলো অনামিকা। কথাগুলো শুনতে পেলো আফ্রিদ। সে বাইরে থেকে সবে বাসায় এসে ঢুকলো তবে চুপ রইলো। মায়ের বিরুদ্ধে যাওয়া মানে সবকিছু হাতছাড়া!
"বাবুটা তো খুব সুন্দর ফুপি।"
"হুম।"
"আফ্রিদির ভাইয়ার মতো দেখতে।"
"একদম ঠিক।"
"বাবুর নাম কী ভাবি?"
"আফিফ!"
মুগ্ধ হলো নিশান,কি সুন্দর চিকন মিষ্টি কন্ঠস্বর মেয়েটার।
"বাহ! খুব সুন্দর নাম তো!"
বাবুটাকে কোলে নিয়ে আদর করতে লাগলো নিশান। বাবুটা এতো কিউট যে আদর না করে কেউই থাকতে পারবে না। একদম গুলুমুলু মায়ের মতো সুন্দর এবং আদলও। ব্যপারটা ভালো লাগলো না নায়লা বেগম এবং নাদিয়ার। নিজের রুমে চলে গেল আফ্রিদ। অনামিকার উপর ভীষণ জিদ হচ্ছে। নিশানের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে কেন জানি ব্যপারটা ভালো লাগলো না। আতঙ্কে আছে অনামিকা। আফ্রিদ তাকে তীক্ষ্মচোখে লক্ষ্য করেছিলো কয়েকবার। আজ রাতে কি হবে কে জানে? হঠাৎ শুনতে পেলো,"আনারকলি! আনারকলি!"
ঘাবড়ে গেল অনামিকা। মাহরীন খাতুন লক্ষ্য করলেন না নায়লা বেগমের সাথে কথা বলায় ব্যস্ত। আফিফকে নিয়ে আদর করতে লাগলো নিশান। কতগুলো চুমু খেয়েছে বাবুটার গালে নিশান নিজেও জানে না। উঠে গেল অনামিকা,ভয়ে ভয়ে রুমের ঢুকলো।
"ডেকেছিলেন?"
"বেডের উপর নোংরা করে রেখেছো কেন?"
তখন ড্রেস পাল্টে নতুন শাড়ি পড়েছিলো তাই বেডের উপর রেখেছিলো এটার জন্য এভাবে চেঁচাতে হয়?ড্রেসগুলো সরিয়ে রাখলো,ভয়ে ভয়ে বেরিয়ে যেতে নেয়।
"আবার কোথায় যাচ্ছ?"
"কিছু লাগবে?"
অনামিকার দিকে তাকায়,নতুন শাড়ি পরেছে। নতুন গয়নাগাটিও গলায়। খুব সুন্দর করে সাজসজ্জা করেছে!
"রূপ দেখাতে যাচ্ছ?"
"বাবুর কাছে যাচ্ছি,আপনার কিছু লাগলে বলুন।"
নিশ্চয়ই বাবুর কথা বলে নিশানের সাথে হেসে হেসে কথা বলবে! কেন জানি ভালো লাগলো না। নিশানের দৃষ্টির মানে বুঝে আফ্রিদ।
"সারা রুম নোংরা করে রেখেছো জলদি গুছাও।"
চারদিকে তাকালো অনামিকা,সবকিছুই ঠিক আছে কোথাও নোংরা নেই। বাবুকে কোলে নিয়ে নিশান ডেকে উঠলো,"ভাবি আফিফ কান্না করছে!"
জানে পানি ফিরে পেলো অনামিকা,দ্রুত বেরিয়ে যেতে নেয়।
"দাঁড়াও।"
থমকে দাঁড়ায় অনামিকা।
"আফিফ কে?"
"আমার ছেলের নাম।"
"বাহ! একটা লাভ ম্যারিজের নাটক সাজিয়েছো তাই বলে নামটাও আমার সাথে মিলিয়ে রাখবে এতো বুদ্ধি কোথায় পেলে?"
"আপনার নামের সাথে মিলিয়ে রাখতে যাবো কেন নামটা আমিই রেখেছিলাম ছোটবেলায়।"
"আমার মুখে মুখে তর্ক করছো?"
"না,সত্যি কথা বলেছি!"
চোয়াল শক্ত করলো আফ্রিদ,নিশাল রুমে ডুকে গেল।
"স্যরি তোমাদের রুমে ঢুকার জন্য,ভাবি বাবুটা কাঁদছে!"
"আমার কোলে দিন।"
আফিফকে কোলে তুলে নেয় অনামিকা। একপলক তাকিয়ে বেরিয়ে যায় নিশান। দু'জনকেই দারুণ মানিয়েছে। আফ্রিদির পাশে অনামিকাকে পারফেক্ট লাগছে! বাবুটা আফ্রিদকে দেখতে পায় আচমকা কোলে যাওয়ার জন্য কেঁদে উঠলো। ওয়াশরুমে ডুকে গেল আফ্রিদ। বাবুটা আরেকটু জোরে কেঁদে উঠলো। কেন জানি অনামিকার খুব খারাপ লাগলো! বাবুটাকে একটু কোলে নিলে কি এমন হতো! চোখজোড়া ছলছল করে উঠলো। বিছানায় শুয়ে মুখে দুধ দিতেই বাবুটা ঘুমিয়ে পড়লো,অনামিকার ও চোখ লেগে গেল। ওয়াশরুম থেকে বের হয় আফ্রিদ। অনামিকাকে ওই অবস্থায় দেখতেই চোখ সরিয়ে নেয়,রাগ হয় খুব। হঠাৎ রুমে ঢুকলেন মাহরীন খাতুন। ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায় আফ্রিদ। অনামিকাকে জাগিয়ে তুললেন ডিনারের জন্য। ব্যালকনি থেকে রুমে ঢুকে আফ্রিদ।
"কোথায় যাচ্ছে ও?"
"খাবার খাবে।"
"রুমে দিয়ে যাও।"
"কেন?"
মৌন রইলো আফ্রিদ।
"শোনো,নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক যেমনই হোক না কেন কখনোই বাইরের কাউকে বুঝতে দেওয়া যাবে না। অর্থাৎ বুঝতে দিবে না। আশা করি তোমরা দু'জন আমার মান-সম্মান রাখবে এর অন্যথা যেন না হয়।"
নিয়ে গেলেন অনামিকাকে। সবাই একসঙ্গে খেতে বসলো। শ্বাশুড়ি মায়ের হাতে টুকটাক এগিয়ে দিলো অনামিকা। আফ্রিদ দূর্ব্যবহার করলেও তার মা খুব ভালো মানুষ। শ্বশুর আর ননদের মুখ গম্ভীর থাকে সবসময়ই। অনামিকা বুঝতে পারে তাকে শ্বাশুড়ি মা ছাড়া আর কেউ পছন্দ করে না। হুট করে এসে পড়লো আফ্রিদির চাচা-চাচী। উনারা বেড়াতে গিয়েছিলেন আজই ফিরলেন। ফ্রেশ হয়ে একসঙ্গে সবাই খাবার খায়। অনামিকার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন উনাদেরকেও। ব্যপারটা ভালো লাগলো না কারোরই। আফ্রিদকেও ডেকে নিয়ে এলো ডিনারের জন্য। নিশান টুকটাক মজার মজার কথা বলছে সবার সাথে। হঠাৎ মৃদু হেসে উঠলো অনামিকা। তা দেখতেই বলে উঠলো,"এই যে ম্যাম এভাবে কেউ হাসে! পাগল হয়ে যাবো তো!"
নিশানের এই কথায় সবাই অনামিকার দিকে তাকাতেই হকচকিয়ে উঠলো সে। মুহূর্তেই হাসি থেমে যায়। আমতা আমতা করতে লাগলো। চোয়াল শক্ত করলো আফ্রিদ। বাড়াবাড়ি অসহ্য রকমের লাগলো। এক বাচ্চার মায়ের প্রতি এইভাবে ইমপ্রেস হওয়াটা কেমন ম্যানার্সের সাথে যায় বুঝে পায় না আফ্রিদ। নীরবে খাবার খেতে লাগলো। ওই মেয়েটাকে বুঝাবে এত হাসি কোথায় থেকে আসে। আতঙ্কে রইলো অনামিকা।
__________
চলবে~
Post a Comment