**পর্ব ৯
_________
এক মাস পরে...
শিখার সকালগুলো একদম একই রকমভাবে কাটছে। বেশিরভাগ সময় সে বাড়ির ভেতরেই থাকে। মনমরা হয়ে থাকা যেন তার দৈনন্দিন জীবনযাপনের একটা অংশ হয়ে উঠেছে। সকালে উঠে মা নূরীর রান্নার কাজে সাহায্য করা, তারপরে বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানো—এই ছিল তার দৈনন্দিন কাজের রুটিন।
মাঝেমাঝে শিখার মনটা চঞ্চল হয়ে ওঠে। রাজের কথা ভেবে সে মনকেমনের ভারে ডুবে যায়। একদিকে রাজের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে তার স্বামীসুলভ আচরণ তাকে বারবার এক দ্বিধায় ফেলে দেয়। সে একরকম নিশ্চিত ছিল না যে, রাজের প্রতি তার ভালোবাসা কতটা গভীর। সত্যিই কি রাজ তাকে মনে রেখেছে? চিঠি লেখার কথা বলেছিল, কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো চিঠি আসেনি।
একদিন সকালে হঠাৎ শিখার মা নূরী তাকে ডেকে বলল, "শিখা, তুই কী ভাবছিস এত? কিছু বলবি আমাকে?"
শিখা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "আম্মা, আপনি তো জানেন সব কিছু। আমি কী বলব আর?"
নূরী একটু হাসল। "তুই রাজের চিঠির অপেক্ষায় আছিস, তাই না?"
শিখা মাথা নিচু করে হেসে ফেলল। "হ্যাঁ, আম্মা। ও তো বলেছিল, চিঠি লিখবে। কিন্তু এখনো কোনো খবর নেই। উনি কি আমাকে ভুলে গেছেন?"
নূরী তার মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, "ধৈর্য ধর মা। সে তোর কথা ভোলেনি। ওর কাজকর্মে ব্যস্ত আছে হয়তো। তবে তোর শ্বশুরবাড়ির লোকজনের মনটা ভালোমতো বুঝে চলতে হবে। সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকলে তোর ভালো হবে।"
শিখা কিছুক্ষণ চুপচাপ রইল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, "আম্মা, আমার শ্বশুরবাড়ির সবাই কি আমাকে সত্যিই ভালোবাসে? আমি বুঝতে পারি না।"
নূরী বলল, "সবাই তোর ভালো চায় না, শিখা। কেউ কেউ আছে যারা তোর পড়াশোনাটা আটকাতে চায়। সাবধানে থাকবি। রাজের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখবি। দেখিস, সব ঠিক হয়ে যাবে।"
_________
এদিকে রাজ ঢাকায় বেশ ব্যস্ত সময় পার করছে। তার কর্মজীবনের চাপ অনেক বেড়ে গেছে। একাধিক দায়িত্বের চাপ তাকে এতটাই ব্যস্ত করে তুলেছে যে, শিখাকে ঠিকমতো সময় দিতে পারছে না। একদিন দুপুরে, কাজের ফাঁকে হঠাৎ করেই তার মনে পড়ে শিখার কথা। সে মিটিং থেকে বেরিয়ে একটা চিঠি লেখার জন্য বসে যায়। চিঠির প্রথম লাইনগুলো লিখতে গিয়েই রাজের মনটা কেমন বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। সে লিখল:
**“প্রিয় শিখা,**
**তুমি কেমন আছো? আমি জানি, তোমার অপেক্ষা দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। তোমার আমার ওপর ক্ষোভ হতেই পারে, কারণ আমি কথা দিয়েও এখনো তোমাকে চিঠি লিখিনি। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি প্রতিদিন তোমার কথা ভাবি। কাজের চাপ এত বেড়ে গেছে যে, কোনোভাবেই সময় বের করতে পারছি না। তবে তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে, সেটা জানার জন্য আমি অধীর হয়ে আছি। তোমার রেজাল্ট কেমন হয়েছে? খুব জানতে ইচ্ছে করছে। আশা করি, তোমার পড়াশোনা নিয়ে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমি ঢাকায় অনেক ব্যস্ত থাকলেও, তোমার পাশে সবসময় আছি।**
**আর একটা কথা। তুমি কি আমার দেওয়া আংটিটা এখনো পরো? সেটা পরলে মনে রেখো, আমাদের সম্পর্কটা সেই আংটির মতোই অমূল্য। তুমি আমার জীবনের অংশ।**
**ইতি, তোমার রাজ।”**
চিঠি লিখে ফেলে রাজ একটু হালকা অনুভব করল। চিঠিটা পোস্ট করার পর থেকেই সে শিখার উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায় থাকল।
_________
এইদিকে শিখা বাড়িতে বসে অপেক্ষা করছে কোনো একটা ঘটনার জন্য। একদিন নূরী এসে বলল, "আজ তোর শ্বশুরবাড়ি থেকে লোক আসবে। তুই প্রস্তুত থাকিস। হয়তো তোর শ্বশুরবাড়ি থেকে কেউ তোর খবর নিতে আসছে।"
শিখা একটু চমকে উঠল। "আম্মা, কে আসছে?"
"তোর শাশুড়ি আর বড় ননদ রাশেদার আসার কথা শুনলাম," নূরী বলল। "তারা তোর খবর নিতে আসছে।"
শিখা বুঝতে পারল না, আসলে কী কারণে তারা আসছে। তার মনটা আবারও অস্থির হয়ে উঠল।
Post a Comment