বাসর ঘরে ঢুকতেই নববধূকে একটি ছোট্ট বাচ্চাকে দুধপান করাতে দেখে হতভম্ব হয়ে গেল আফ্রিদ। মুহূর্তেই কেমন যেন অনুভূতি হলো তার ঠিক বোধগম্য হলো না। শ্বাস আঁটকে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে নববধূর সামনে দাঁড়ায়। নতুন বরের উপস্থিতি টের পেতেই ভড়কে গিয়ে কেঁপে উঠলো অনামিকা। ছোট্ট বাবুটাকে দুধপান বন্ধ করে শরীরের কাপড় ঠিক করতে নিতেই রাশভারী গম্ভীর স্বরে শোনা গেল,"বেবিটা কার?"
কেঁপে উঠলো অনামিকা। নিশ্চুপ থাকতে দেখে ধমকে উঠলো আফ্রিদ।
"বলো এটা কার বেবি?"
ঘোমটার ভেতর থেকে কম্পিত স্বরে বলল,"আ..আমার।"
"সত্যি বলছো?"
মাথা নাড়ালো অনামিকা।
"আর ইউ ম্যারিড?"
এবারও মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো। আফ্রিদির কি হলো কে জানে,আচমকা শক্ত করে গলা চেপে ধরলো অনামিকার। ঘাবড়ে গিয়ে বাঁচার জন্য ছটফট করতে লাগলো অনামিকা। ভয় পেয়ে কোলের মধ্যে থাকা ছোট্ট বেবিটা ভীষণ জোরে কেঁদে উঠলো। মায়া হলো না আফ্রিদির। ছেলের ঘর থেকে চিৎকার চেঁচামেচি এবং গোঙানির শব্দ শুনতেই একপ্রকার ছুটে এলেন মাহরীন চৌধুরী। বেবিটাকে কোলে তুলে চেঁচিয়ে উঠলেন,"নতুন বউয়ের সাথে এটা কেমন ব্যবহার আফ্রিদ?"
"এইসব কী হচ্ছে আমার সাথে?"
"কোথায় কী হয়েছে?"
"এই মেয়ে এখানে কী করছে?"
"কী করছে মানে! ও তোমার স্ত্রী?"
"স্ত্রী মাই ফুট! তোমরা সবাই আমাকে ঠকালে।"
"ওকে ছাড়ো বলছি!"
আচমকা ধাক্কা দিয়ে মাকে রুম থেকে বের করে ডোর আঁটকে দিলো আফ্রিদ। ভয়ে গুটিশুটি হয়ে কাঁপতে লাগলো অনামিকা। আফ্রিদকে ভয়ংকর দেখাচ্ছে! ফের গলা চেপে ধরতেই হঠাৎ মাথা থেকে ঘোমটা পড়ে যায়। তাকাতেই আফ্রিদ অবাক হয়ে গেল।
"তুমি সত্যিই বিবাহিত?"
অশ্রুসিক্ত নয়নে অসহায় নেত্রে তাকালো অনামিকা।
"উত্তর দাও।"
মাথা নাড়ালো অনামিকা।
"নাম কী?"
ধমকে উঠলো,কেঁপে উঠলো অনামিকা।
"কী হলো?"
"আ..অনা.."
বলতে দিলো না,আরো জোরে গলা চেপে ধরলো।
"আনারকলি?"
কিছু বলতে পারলো না অনামিকা। জলপ্রপাতের ন্যায় চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াতে লাগলো। আফ্রিদ তাকায়,মেয়েটার নাম আনারকলি হলে মন্দ নয়! তবে মেয়েটির সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গেলে পাকা আনার বা ডালিমের দানার মতো রক্তিম! আর যৌবন সে-তো রক্তজবা কলির মতো অসম্ভব সুন্দর! আচমকা চোখের দিকে দৃষ্টি পড়লো। মেয়েটার চোখের রঙ নীলাভ-সবুজ। এই চোখের রঙ বেশ বিরল। তবে মন দিয়ে দেখলে মনে গেঁথে যাবে এতটাই সুন্দর! শুধু তাই নয়,বড় বড় দু-চোখে অনেক গভীরতা! কি মায়া! কি জাদু! হুট করে মনে পড়লো ঐশ্বরিয়া রাইয়ের কথা। তার চোখের রঙ ও সেইম কালার। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো আফ্রিদ।
"লেন্স লাগিয়েছো?"
"ন..না।
"
"লেন্স খোলো।"
ভয়ে কথা বলতে পারছে না অনামিকা। তবে জলপ্রপাতের ন্যায় গড় গড় করে চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে মেদুর দুগালে।
"আ..আমার চোখ এমনই,লেন্স খুলবো কী করে?"
"যাকে দুধপান করিয়েছে সে কে?"
"আ..আমার ছেলে।"
"তুমি আগে থেকে ম্যারিড?"
কাঁপতে লাগলো অনামিকা।
"জ..জি।"
আচমকা মুখ বেঁধে বেল্ট এনে ইচ্ছেমত প্রহার করতে লাগলো অনামিকাকে। যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে সেন্সলেস হয়ে পড়লো। বেল্টের আঘাতে সারা শরীর রক্তাক্ত করে ফেললো আফ্রিদ। ডোর খুলে বেরিয়ে যেতে নিতেই মাহরীন চৌধুরীর মুখোমুখি হলো।
"কী করেছো ওকে?"
"পানিশমেন্ট।"
"কীসের পানিশমেন্ট?"
"আমাকে ঠকানোর।"
"সত্যি তুমি কোন মানুষ?"
"ডাউট আছে?"
"যে পুরুষ নারীকে সম্মান করতে পারে না সে কখনো মানুষ হতে পারে না। তুমি একটা অমানুষ।"
বেরিয়ে যায় আফ্রিদ। মন-মেজাজ বিক্ষিপ্ত হয়ে গেল। সিরিয়াসলি তার মতো এত সুদর্শন একজন পুরুষ কি-না শেষ-মেষ এক বাচ্চার মাকে বিয়ে করেছে! এটা কি সে ডিজার্ভ করে? তার বন্ধুমহল থেকে শুরু করে পরিচিত আত্মীয়স্বজনরা কী ভাববে?
বেবিটাকে কোলে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন মাহরীন চৌধুরী। অনামিকার অবস্থা দেখতেই আঁতকে উঠলেন। বকতে লাগলেন ছেলেকে। বাচ্চাটাও খুব কাঁদছে! খিদে পেয়েছে বোধহয়! অনামিকার চোখে-মুখে পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফিরালেন। কিছুক্ষণ বাদেই গা কাঁপিয়ে জ্বর এলো। খুব খারাপ লাগলো মাহরীন চৌধুরীর। জুবুথুবু হয়ে শীতে কাঁপতে লাগলো অনামিকা। মেডিসিন খাইয়ে বেবিটাকে ঘুম পাড়িয়ে শুয়ে পড়লেন অনামিকার পাশে।
০২.
রাত প্রায় তিনটা বাজতেই ডোরে করাঘাত পড়লো। ঘুম ভেঙ্গে গেলেও ডোর খুললেন না মাহরীন চৌধুরী। করাঘাত বেড়ে গেল। বাধ্য হয়ে উঠে বসেন। অনামিকার কপালে হাত দিতেই চমকে উঠেন। ভীষণ জ্বর এসেছে,একটুও কমেনি। থরথর করে কেমন করে কাঁপছে! এদিকে করাঘাত ও কমছে না। বাড়ির লোকজন উঠে পড়বে সেই ভয়ে দ্রুত ডোর খুলে দিতেই টলতে টলতে ভেতরে ঢুকলো আফ্রিদ।
"এতক্ষণ লাগে ডোর খুলতে?"
"আজ আবারও মদ গিলেছো?"
"প্রতিদিনই তো গিলি।"
"উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলে,বেরিয়ে যাও বলছি।"
"তুমি আমার রুমে কী করছো?"
"আচ্ছা,তুমি কী পশু?"
"এমনটা কেন মনে হলো তোমার?"
"এভাবে মা'র'লে কেন মেয়েটাকে?"
"ও একটা ঠকবাজ,প্রতারক!"
"কী করেছে তোমাকে?"
"ওর বাচ্চা আছে,বিয়ে হয়েছে আবার আমাকে বিয়ে করলো কেন?"
"চুপ করো! খবরদার এটা কখনো কাউকে বলবে না।"
"বলবো না মানে? সবাইকে বলবো।"
"একদম চুপ।"
বেবিটা হঠাৎ কেঁদে উঠলো। দ্রুত কোলে তুলে নিলেন।
"যাও অন্য রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ো,আমি আজ এখানে ঘুমাবো।"
ধাক্কা দিয়ে মাকে বের করে দিয়ে ডোর বন্ধ করে ফেললো আফ্রিদ। বেশ কয়েকবার ডোর ধাক্কান তিনি কিন্তু লাভ হলো না। গুটিগুটি পায়ে অনামিকার দিকে এগিয়ে যায় আফ্রিদ। দেখলো চিকন-পাতলা ঠোঁটগুলো কেমন করে কাঁপছে! নেশালো চোখে ঘোর লেগে যায় আফ্রিদির। পরিহিত শেরওয়ানি খুলে বেডের উপর বসলো। নিভু নিভু চোখে অনামিকার দিকে তাকিয়ে রইলো। শীতে কাঁপছে অনামিকা!
"আনারকলি! এই আনারকলি!"
সায় দিলো না অনামিকা। কেন ডাকছে আফ্রিদি নিজেও জানে না।
"এই আনারকলি!"
সায় দিলো না অনামিকা। আচমকা কাছে টেনে আনলো। ঘুমু ঘুমু কম্পিত চোখে তাকাতেই চোখের সামনে আফ্রিদকে দেখতেই ভয়ে চিৎকার করে উঠে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চায় অনামিকা,কিন্তু পারলো না শক্ত করে চেপে ধরলো আফ্রিদ। ফের চিৎকার করতে নিতেই করতে দিলো না,নিজের ঠোঁট দুটো এগিয়ে নিলো অনামিকার ঠোঁটের দিকে।
০৩.
তীব্র ব্যথায় যন্ত্রণায় সারারাত কাতরাতে লাগলো অনামিকা। ফের গা কাঁপিয়ে জ্বর এলো। নিজের কাজ শেষ করে উপুড় ঘুমাচ্ছে আফ্রিদ। দিন-দুনিয়ার খবর নেই তার। ভোরের আলো ফুটতেই উঠে বসলো অনামিকা। জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে,আর থাকা সম্ভব হচ্ছে না। দেয়াল ধরে ওয়াশরুমে ঢুকে শাওয়ার নিতে লাগলো। পানি পড়তেই সারা শরীর জ্বলে উঠলো। শাওয়ারের পানির সাথে চোখের জল মিশে একাকার হয়ে গেল। বুক অব্ধি একখানি টাওয়াল পেঁচিয়ে ওয়াশরুম থেকে এক পা বের করতেই আচমকা মাথা ঘুরে পড়ে গেল। ধড়ফড়িয়ে ঘুম থেকে উঠে বসলো আফ্রিদ। ঘুমু ঘুমু চোখে দেখলো ওয়াশরুমের সামনে ফ্লোরে পড়ে আছে অনামিকা। মাথা ফেটে রক্ত বেরুচ্ছে। কি বুঝে বেড থেকে নামতেই উপলব্ধি করলো তার গায়ে কোনো পোশাক নেই। খেয়াল করলো অনামিকার শাড়ি,গয়না সব বিছানার উপর ছড়ানো ছিটানো। বুঝতে বাকি নেই নেশার ঘোরে সে অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়ে বসে আছে। আকস্মিক ব্রহ্মতালু উত্তপ্ত হয়ে গেল। শরীরে পোশাক জড়িয়ে রক্তাক্ত অনামিকার গলা চেপে ধরে টেনে তুললেই আর্তনাদ করে উঠলো। এত জোরে চেপে ধরলো যে অনামিকার শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে চোখ-মুখ বেরিয়ে এলো। সমানে গোঙাতে লাগলো,কিন্তু দয়ামায়া হলো না আফ্রিদির। অনামিকা বুঝতে পারছে না এ সে কোন পাপের শাস্তি পাচ্ছে!
"দোহাই লাগে,আমাকে মা'র'বে'ন না! আমি সহ্য করতে পারি না! দয়া করে ছেড়ে দিন।"
"নেশা ঘোরে আমার মাতাল হওয়ার সুযোগ নিয়েছিস তাই না?"
অশ্রুসিক্ত নয়নে দু-পাশে মাথা দুলালো অনামিকা।
"বিশ্বাস করুন,আমি কিচ্ছু করিনি। আপনিই তো..!"
"সাট আপ!"
কেঁপে উঠলো অনামিকা। গলগল করে রক্ত ঝরছে মাথা থেকে,দয়া-মায়া হলো না আফ্রিদির।
"নাটক করছিস আমার সাথে?"
আচমকা আছাড় মা'র'লো ফ্লোরে,ভীষণ জোরে আত্মচিৎকার করে উঠলো অনামিকা। শুনতে পেয়ে একপ্রকার দৌঁড়ে এলেন মাহরীন চৌধুরী। জোরে জোরে ডোর নক করলেন,বিরক্ত হয়ে ডোর খুললো আফ্রিদ।
"সমস্যা কী?"
"বাসার মধ্যে এইসব কী শুরু করেছো তুমি?"
"ও একটা সুবিধালোভী মেয়ে।"
"চুপ করো অসভ্য ছেলে।"
"এটা চুপ করার বিষয়?"
"ওর গায়ে হাত তুললে কোন সাহসে?"
"একদম ঠিক করেছি।"
"মেয়েদের গায়ে হাত তোলার মধ্যে কোনো পুরুষত্ব নেই। মেয়েদেরকে যে সম্মান করতে জানে না তার পারিবারিক এবং ধর্মীয় শিক্ষার বড়ই অভাব। তুমি একজন নারীর সন্তান,একজন নারীর স্বামী এবং কোন এক নারীর বাবা হবে তখন এই দৃশ্যগুলোও তোমার একদিন মনে পড়বে।"
_______________
#আনারকলি ❤️
#মেহেরিন_আনজারা_নিশা ❤️
#পর্বসংখ্যা-(০১)
#চলবে~

Post a Comment